My Blog My World

Collection of Online Publications

এ যেন রবি ভাই!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থার প্রথম দিকে উঠেছিলাম জহুরুল হক হলে। সাধারণ পুলিশের সঙ্গে ক্যান্টনমেন্টের কী সম্পর্ক তা আজো জানিনা। তবে সব সময় গন্ডগোল মেটাতে গেটে পুলিশ থাকতো বলে এ হলকে অনেকে ক্যান্টনমেন্ট বলতো। ভাগ্য আমার ভালই ছিল। প্রথমে গণরুম, এরপর অল্প দিনের মাথায় সিনিয়র বন্ধুদের সহায়তায় আশ্রয় হয় এক্সটেনশন বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলার সর্বশেষ রুমে। ঠিক পাশেই বাথরুম, টয়লেট থাকায় পাতি ও তথাকথিত পাতি নেতারা এই রুম নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতেননা। উল্টো নেতাদের শায়েস্তা করার উপায় নিয়ে মাথা ঘামাতাম আমরা। নেতাদের কেউ বাথরুম বা টয়লেটে ঢুকলে বাইরে থেকে দরজা লক করে দিয়ে দল বেধে লাইব্রেরিতে ছুটতাম আমরা সবাই। রুমের মুরুব্বি বলতে ছিলেন একমাত্র রবি ভাই। চাকরি না পাওয়ায় তার ছাত্রজীবনটা প্রেমে ছ্যাঁকা খাওয়ার সংখ্যার মতো বেড়ে চলছিল। রুমমেটরা সামনে তাকে ভাই বলে সম্বোধন করলেও আড়ালে ডাকতো ‘আঙ্কেল’ বলে। রবি ভাইয়ের মতো একজনকে নিয়ে যেহেতু লিখছি তাই রবি ভাইয়ের ব্যাপারেই ফিরে আসি।

ব্যাচারা রুমে আসতো কেবল ঘুমানোর জন্য। এমফিলের ছাত্র, তাই বই হাতে নিয়ে লাইব্রেরিতে ঢুকে সারাদিন কাটিয়ে দিতে পারতো। তবে রাতে তার ঝামেলার অন্ত ছিলনা। আমাদের কারো অপছন্দের কোনো গেস্ট আসলেই থাকতে দিতাম রবি ভাইয়ের বিছানায়। আর আমাদের কেউ রবি ভাইয়ের বিছানায় ঘুমালে শরীরের উপর পা তুলে দিত। বোঝাতো যেন ঘুমের ঘোরেই সবকিছু হচ্ছে। নারী বিমুখ রবি ভাইকে ক্যাম্পাসে যত মেয়ের সঙ্গে ঘুরতে দেখেছি গল্প শুনেছি তার চেয়ে অনেক বেশি। একবার কে যেন তাকে কলাভবনের পাশে অন্ধকারে এক মেয়ের ওড়না ধরে টানাটানি করতে দেখেছে। তখন আমেরিকা ইরাকে হামলা করবে এমন সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠেছে। রাতে রবি ভাই রুমে আসার পর সবাই তার কাছে জানতে চাইলো যুদ্ধ হবে কিনা। তিনি আমাদের সঙ্গে তর্কে জড়াতে অনীহা প্রকাশ করে বললেন, তিনি যুদ্ধের কিছু বোঝেননা। আমাদের এক রুমমেট ক্ষেপে গিয়ে বললো, ‘কলাভবনের অন্ধকার গলিতে বসে এতক্ষণ যুদ্ধ করে আসলেন আর আপনি যুদ্ধ বোঝেননা। বুড়া বয়সে এসব ফাজলামি ছাড়েন। বিয়ে করেন।’ সবকিছু আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা তাকে থামালাম। আমাদের এক বন্ধু অতি বিনয়বশত তার কাছে ক্ষমা চাইতে গিয়ে চোখের জল ঝড়ালো। রবি ভাই আমাদের এসব ফাজলামি বুঝতেন কিনা জানিনা। তবে মাঝে মাঝে উদাস হয়ে বিরহের গান শুনতেন। তার ট্রাঙ্ক ভর্তি মেয়েদের ছবি যে আছে তা আমরা জানতাম। এও জানতাম তার বিয়ে না করার সঙ্কল্পের কথা। মাঝখানে এমন এক সময় এলো যখন তিনি নারী বিষয়ক কোনো কথাই শুনতে পারেননা। একবার তার ভাগ্নের প্রেম বিষয়ক ঝামেলা সামাল দিতে তিনি তার গ্রামের বাড়িতে গেলেন। ক’দিন পর তার ভাগ্নের মুখেই শোনা গেল, রবি ভাই তার ভাগ্নেকে গাছে বেঁধে পিটিয়েছেন। অনেক দিন হয়ে যায়, রবি ভাই বাড়ি থেকে ফিরে আসেননা। এরপর একদিন মধ্যরাতে দরজায় কড়া পড়লো। ভেতর থেকে আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে?’ উত্তর এলো, ‘রবি’। আমরা আবার জানতে চাই, ‘কোন রবি?’ তিনি বলেন, ‘তোমাদের রবি ভাই। এমফিল করছি।’ আমরা সবাই তাকে স্বাগত জানালাম স্লোগান দিয়ে। এরপর যা শুনলাম তা কখনোই ভাবিনি। তিনি বিয়ে করেছেন তার ভাগ্নের প্রেমিকাকে। শশুড় একাত্তরের কুখ্যাত রাজাকার, তখন বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী। পরদিন সকালে তিনি আমাদের বললেন, ‘প্রেমে পড়ে গেলাম। জীবনে একটা লাগাম চলে আসলো।’ আমাদের আরেক বন্ধু রাজাকারপুত্র রবি ভাইয়ের পক্ষে সাফাই গেয়ে বললো, বিয়ের পরে প্রেম ফরজ।

আজ থাক রবি ভাইয়ের কথা। তিনি আজ শশুড়ের আশীর্বাদে কোনো এক জেলার জাঁদরেল ম্যাজিস্ট্রেট। এমন বউ ভক্ত যে যেন জীবনে ঐ নারী ছাড়া আর কাউকে কোনো দিন দেখেননি। ২০০৯ সালের জুলাই মাসে আমি এমন আরেক রবি ভাইয়ের দেখা পেয়েছি। পুরনো সব প্রেম, ইতিহাসকে অতীত করে রবি ভাইয়ের পথ ধরেই হাঁটছেন তিনি। এ যেন রবির পথে যাত্রা।

Advertisements

August 26, 2009 - Posted by | Personal

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: