My Blog My World

Collection of Online Publications

আগামীর জন্য ওবামার সম্ভাব্য শ্রেষ্ঠ উপহার

নূর আল-হোসেন
সেকেলে এক অস্ত্র নিষিদ্ধ করতে অনীহা দেখিয়ে এক যুগ কাটিয়ে দিল যুক্তরাষ্ট্র। অথচ তার অস্ত্র ভান্ডারে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের কোনো কমতি নেই। প্রযুক্তির যুগে সেকেলে হওয়া অস্ত্র স্থল মাইন শান্তিপূর্ণ সময়েও কেড়ে নিয়েছে অসহায়, নিরাপরাধ নারী-পুরুষ এবং শিশুর জীবন। আবার আমৃত্যু পঙ্গুত্বের অভিশাপে পুড়ছে অনেকে। বর্তমানে বিশ্বের ৮০ টিরও বেশি দেশের মাটিতে পেতে রাখা আছে লাখ লাখ স্থল মাইন। মজুদ আছে এক কোটি ৬০ লাখেরও বেশি স্থল মাইন। জীবন্ত যে কোনো কিছু এর সংস্পর্শে আসার পর যখন এর উপস্থিতি টের পাওয়া যায় তখন আর কিছুই যেন করার থাকেনা। স্কুলগামী শিশু, মাঠে কাজ করা কৃষক বা বিচরণরত গবাদি পশু কেউই বাদ যায়নি স্থল মাইনের আঘাত থেকে। এক একটি স্থল মাইনে এক একটি প্রাণের মৃত্যু। এমন নিরব ঘাতকের হানার ভয়াবহতা ছাড়িয়ে গেছে বায়োলজিক্যাল, রাসায়নিক এমনকি পারমানবিক অস্ত্রকেও। স্থল মাইন বিস্ফোরণের শিকার হতভাগাদের তাৎনিক মৃত্যু না হলেও পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়।
সম্ভবত, স্থল মাইন ব্যবহারের সবচেয়ে নিষ্ঠুর দিক হলো এর মাধ্যমে কোনো দিন শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দেখা যায়, যুদ্ধ বা সংঘাত শেষে বিবদমান গোষ্ঠী বা যোদ্ধারা নিজ নিজ ভূখন্ডে চলে যাওয়ার পর বা শান্তি চুক্তি স্বারিত হওয়ার অনেক পরও পেতে রাখা স্থল মাইন বিস্ফোরিত হচ্ছে। যুগ যুগ ধরে স্বাস্থ্যগত, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত তির শিকার হচ্ছে মানুষ।
গত ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে আমি বিশ্বের স্থল মাইন এলাকাগুলোতে ছিলাম। কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম থেকে পাকিস্তান, বসনিয়া, কলম্বিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকার সরকারগুলোর সঙ্গে আমি স্থল মাইন বিরোধী প্রচার চালিয়েছি, দুর্দশা দেখেছি স্থল মাইন বিস্ফোরণের শিকার শত শত মানুষের। ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু ব্যান ল্যান্ডমাইন্স অ্যান্ড সারভাইভার কোর’ এর সঙ্গে কাজ করার সময় স্থল মাইন বিস্ফোরণে আহতদের শরীর, জীবন এবং পরিবারের য়তির অবস্থা দেখার সুযোগ আমার হয়েছে।
১০ বছর আগে এই ডিসেম্বর মাসেই মাইন নিষিদ্ধকরণ চুক্তি স্বারিত হয়েছিল। এই চুক্তিতে মাইন ব্যবহার নিষিদ্ধ করাসহ মজুদ ধ্বংস এবং পেতে রাখা মাইন অপসারণের কথা বলা হয়েছে। এরপর বিশ্বের ১৫৬ টি দেশ এই চুক্তিতে স্বার করেছে। ধ্বংস করা হয়েছে চার কোটি ৪০ লাখেরও বেশি মাইন। মাইন বিস্ফোরণে হতাহতের সংখ্যা বছরে ২৫ হাজার থেকে পাঁচ হাজারে নেমে এসেছে। ন্যাটো সদস্য দেশগুলো এ চুক্তিতে স্বার করলেও কিউবা, পাকিস্তান, চীন, উত্তর কোরিয়া এবং ইরানের মতো বাইরে রয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র।
যে অস্ত্রে যুদ্ধ জয় করা যায়না এবং মার্কিন বাহিনী যেখানে গত ২০ বছরে এই অস্ত্র ব্যবহার করেনি- এমন সেকেলে অস্ত্র ব্যবহার স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করতে কেন যুক্তরাষ্ট্রের এত অনীহা? এ প্রশ্নের উত্তর হলো, পেন্টাগন মনে করে, আজ স্থল মাইন কাজে আসছেনা। হয়তো ভাবষ্যতে এর ব্যবহার প্রয়োজন হতেও পারে। ইরাক এবং আফগানিস্তানও স্থল মাইন নিষিদ্ধ করেছে। স্থল মাইন নিষিদ্ধকরণ চুক্তির আওতায় স্থল মাইন ব্যবহার সম্পর্কিত কোনো ধরনের প্রযুক্তি বা সহযোগিতা প্রদান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে বাগদাদ বা কাবুলে মার্কিন বাহিনী অন্যান্য আন্তজার্তিক বাহিনীগুলোর সঙ্গে স্থল মাইন ব্যবহার নিয়ে আলোচনা বা পরিকল্পনা করতে পারছেনা। ফলে স্থল মাইন নিয়ে একলা চলতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে।
সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো স্থল মাইন এ পর্যন্ত কোনো সংঘাত বা যুদ্ধেই চূড়ান্ত সাফল্য আনতে পারেনি। ২০ টি দেশের ৫০ টি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিবেদনে নিয়ে আন্তর্জাতিক রেডক্রস-রেড ক্রিসেন্টের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২৬ টি সংঘাতে স্থল মাইন ব্যবহার করা হলেও জয়-পরাজয়ে তা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেনি। তবে স্থল মাইন ব্যবহারের ফলে শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা বেড়েছে।
আমার প্রয়াত স্বামী বাদশাহ হোসেন জর্ডানে স্থল মাইন নিষিদ্ধ করতে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেন। ২০০০ সালের মধ্যে জর্ডান উপত্যকাকে মাইন মুক্ত করার ঘোষণা দিলেও ২০০৩ সালে আমাদের ৯২ হাজারেরও বেশি মানব বিধ্বংসী মাইনের মজুদ ধ্বংসের মাধ্যমে তা বাস্তবায়িত হয়। এ েেত্র ধন্যবাদ দিতে হয় যুক্তরাষ্ট্রকে। যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের মাইনের মজুদ ধ্বংস না করলেও বিশ্বকে মাইন মুক্ত করতে অর্থায়ন করে যাচ্ছে। ৪৭ টিরও বেশি দেশকে মাইন মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি খরচ করেছে। ছোট সস্তা মাইন ব্যবহার করে যুদ্ধ জয় করা যায়না- এ সত্যটুকু স্বীকার করতে যুক্তরাষ্ট্রের বাধা কোথায়? যুক্তরাষ্ট্র নিজেই তো এখন তাদের সীমান্ত, শিবিরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছে! বিশ্বে অস্ত্রের ব্যবহার এবং মানবাধিকার বিষয়ক আইনের ব্যাপারে মার্কিন নেতৃত্বের ধারণাকে বদলে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ওবামা প্রশাসন। স্থল মাইন নিষিদ্ধকরণ চুক্তিতে স্বার করে বিশ্বে একে বিলুপ্ত করার সময় এসেছে। বিশ্ব এখন ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের অপোয়।
ওবামা প্রশাসনকে মনে রাখা ইচিত যে, স্থল মাইনের বিরূদ্ধে যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার যুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পেতে রাখা মাইনের আঘাতে ত-বিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে বিশ্বের কোনো যুদ্ধ বিদ্ধস্ত অঞ্চলে শান্তি আসবেনা। ১৯২৫ সালে চিরতরে বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নোবেল জয়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন। তার মতো প্রেসিডেন্ট ওবামাও যাবেন অসলোতে নোবেল শান্তি পুরস্কার নিতে। আমাদের প্রত্যাশা, সেখানেই তিনি মাইন বিরোধী বিশ্ব আন্দোলনে মার্কিন সম্পৃকতার ঘোষণা দেবেন। আগামী প্রজš§কে দেবার জন্য নোবেল জয়ী ওবামার এর চেয়ে বড় কোনো উপহার আছে বলে আমি মনে করিনা।
নূর আল-হোসেন: জর্ডানের রাণী, ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু ব্যান ল্যান্ডমাইনস এর উপদেষ্টা এবং সারভাইভার কোরের পৃষ্ঠপোষক।

হাফিংটন পোস্ট থেকে ভাষান্তর মেহেদী হাসান তালুকদার

December 8, 2009 - Posted by | International, Peace | ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: