My Blog My World

Collection of Online Publications

আফগানিস্তান: ভারত-পাকিস্তানের অদৃশ্য যুদ্ধ…..

বব চার্চার
প্রেসিডেন্ট ওবামা দীর্ঘ প্রতিক্ষীত নতুন আফগান পরিকল্পনা ঘোষণা করলেন ঠিকই কিন্তু তাতে আফগান যুদ্ধ থেকে সৃষ্ট জটিল সমস্যাগুলো গুরুত্ব পেলোনা। তার বক্তব্যে দু’টি বিষয় প্রকাশ পেয়েছে। প্রথমত, আফগানিস্তানে সর্বত্র দূর্নীতি। দ্বিতীয়ত, আফগানিস্তানে সমস্যা সৃষ্টিকারীর ভূমিকায় প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান। ওবামা স্বীকার না করলেও এই সমস্যাগুলো যে ভয়াবহ হয়ে উঠছে তা অনেক দূরে বসেও জানা যায়।
আফগানিস্তানে কাজের তিক্ত ও হতাশাজনক অভিজ্ঞতার কয়েক বছরের সমীক্ষা প্রতিবেদন পড়ে আমি এই সমস্যাগুলোর ব্যাপকতা বুঝতে পারি। ২০০১ সাল থেকে অতি সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত আমি আফগান নিরাপত্তা বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করেছি। এছাড়া আফগান ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা, আফগানিস্তান পূনর্গঠন, আফগানিস্তানে মোতায়েনের জন্য ন্যাটো সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। স্থানীয় এবং আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সড়ক পথে আফগানিস্তান ঘুরে বেড়িয়েছি আমি।
আফগানিস্তানে একজন বিশ্বাসযোগ্য শরীক পাওয়া আজ ওবামার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ওবামা চান আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই দূর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করুক। আবার আফগান জনগণের মধ্যে বিদেশি ত্রাণ দূর্নীতমুক্ত ও সুষ্ঠুভাবে বিতরণের জন্য কারজাইকে এ প্রক্রিয়ার বাইরে রাখতে চান তিনি। বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। দায়িত্বপালনকালে আফগান জনগণের জন্য শুভ কামনা করা ছাড়া আমার আর কিছু করার নেই।
ওবামার আফগান পরিকল্পনার মূল বিষয় কি আফগান ন্যাশনাল আর্মি ? আমরা অর্থাৎ বিদেশি সৈন্যরা আফগানিস্তান ছাড়ার পরপরই তাদের আফগানিস্তান রার দায়িত্ব নেওয়ার কথা। কিন্তু আফগানিস্তানের নতুন সেনা বাহিনী তো যোগ্যতার বিচারে কোনো পেশাদার বাহিনী নয়। এটি যেন ছায়া বাহিনী, পোশাকধারী এই বাহিনীর উপর আফগান প্রেসিডেন্টের ভরসা আছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ব্রিটিশ এবং আমেরিকান সরকারের আর্থিক সহায়তায় মূলত সাবেক নর্দার্ন অ্যালায়েন্স মিলিশিয়াদের নিয়ে পূণর্গঠিত আফগান সেনাবাহিনীতে পর্যাপ্ত জনবল নেই। এরচেয়ে দূর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো আফগান সৈন্যদের তাড়া করে ফিরছে মাদকাসক্তি এবং হতাশা।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আফগান ন্যাশনাল আর্মিকে তাজিক আর্মি বলা যায়। এই বাহিনীতে আফগানিস্তানে দ্বিতীয় বৃহত্তম নৃগোষ্ঠী তাজিকরাই গুরুত্ব পেয়েছে। তাজিকরা মূলত আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলে বসবাস করে। বৃহত্তম নৃগোষ্ঠী পশতুনদের দাপট দণিাঞ্চলে। এই পশতুনারাই তালেবানদের সমর্থন দিয়েছিল। তাজিক আর পশতুনদের মধ্যে বিরোধ দীর্ঘদিনের। তাজিক নেতৃবৃন্দের চোখে হামিদ কারজাই পশতুন নৃগোষ্ঠীর মানুষ। তিনি তাজিকদের প্রেসিডেন্ট নন। আর আফগান যুদ্ধও তাদের নয়। অনেক মার্কিন সৈন্য ল্য করেছে যে, তাজিকরা প্রয়োজনে প্রেসিডেন্ট হামিদ করজাইকে হত্যা করতে চায়। তাজিক সৈন্যরা ন্যাটো সৈন্যদের পরিবর্তে পশতুন অধ্যুষিত এলাকায় অভিযান চালাতে চায়। আমার মনে হয়, পশতুনরা কখনো এ অভিযানকে আফগান সেনাবাহিনীর অভিযান মনে করবেনা। আফগান সেনাবাহিনী পশতুন অভ্যুষিত এলাকায় অভিযানে গেলেই তাকে পশতুনদের বিরুদ্ধে তাজিকদের অভিযান হিসেবে মনে করা হবে। এককথায় আফগানিস্তানের বর্তমান সেনাবাহিনী তালেবানদের পরাজিত করতে পারবেনা।
এবার আমাদের আরেক কৌশলগত শরিক পাকিস্তান প্রসঙ্গে আসা যাক। সরকার যাই বলুক না কেন, আমরা সৈন্যরা বিশ্বাস করি যে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের পে নয়। বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থ সাহায্য পাওয়ার লোভে তারা দৃশ্যত আমাদের প নিয়েছে। আফগানিস্তান শক্তিশালী হোক- এটা পাকিস্তান চায়না। পাকিস্তান সেনা বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তারা দেখছে যে, নয়াদিল্লি ইসলামাবাদের চেয়ে কাবুলের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে বেশি আন্তরিক। ভারত অতীতে আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট সরকার এবং পরবর্তীতে নর্দার্ন অ্যালায়েন্সকে সমর্থন করেছে। বর্তমানে হামিদ কারজাইয়ের আফগানিস্তানকে সাহায্য করছে। আফগান সরকারের সঙ্গে ভারত সরকারের এতো সম্পৃক্ততা পাকিস্তান ভালোভাবে নেবে-এটা কে বিশ্বাস করবে? আমরা আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার পর পাকিস্তান আফগানিস্তানের উপর কর্তৃত্ব খাটাতে চায় বলেই মনে হচ্ছে। দূর্বলতা সত্বেও আফগান রাজনীতিকদের মদদে পাকিস্তানের পশতুন অধ্যুষিত উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং কেন্দ্র শাসিত উপজাতীয় এলাকায় বসতি গড়েছে আফগান শরণার্থীরা। আফগানিস্তান ১৮৯৩ সালে ডুরান্ট লাইন মেনে নেওয়ার মাধ্যমে ব্রিটিশ ভারতের কাছে এই এলাকা দুটি হারিয়েছিল । ১৯৫০ এর দশক এবং ৬০ এর দশকের প্রথম দিকে পাকিস্তানের কাছ থেকে ঐ এলাকাগুলো ফেরত পেতে সশস্ত্র উপজাতী গ্র“প পাঠিয়েছিল আফগানিস্তান। এ কারণেই ১৯৭০ এবং ৮০’ র দশকে মার্কিন সমর্থিত মুজাহিদদের ব্যাপক সাহায্য করেছে ইসলামাবাদ।
ইসলামাবআদ মনে করে সোভিয়েতদের মতো একদিন ওবামার মার্কিন জোটও আফগানিস্তান ছেড়ে যাবে। তখন পাকিস্তানি সমর্থনপুষ্ট সরকারকে কাবুলের মতায় বসিয়ে ভারতকে কৌশলগত চাপে রাখা যাবে। ভারতকে চাপে রাখতে পারবে পাকিস্তানের এমন বন্ধু সরকার কে হতে পারে? তালেবানরা সম্ভাব্যের তালিকায় এগিয়ে থাকবে। আর পাকিস্তান যদি আফগানিস্তানে তাদের বন্ধু সরকার না পায় তাহলে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক আছে এমন আফগান সরকারের চেয়ে অস্থিতিশীল আফগানিস্তান দেখতে চায় ইসলামাবাদ। জঙ্গি হামলায় পাকিস্তানে রক্ত ঝরলেও কেন্দ্রে থাকা সরকারের তালেবানদের প্রতি সমর্থন রয়েই গেছে। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রতি পাকিস্তানের সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ বেশ পুরনো।
পাকিস্তানি বাহিনী বিপুল সংখ্যক জঙ্গিকে গ্রেফতার করছে যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করার জন্য। সত্যি কথা বলতে সামরিক ব্যয় মেটানোর জন্য পাকিস্তানের প্রচুর অর্থ প্রয়োজন। নাজুক অর্থনীতির মধ্যেও দেশটি এখনো ভারতের হামলা মোকাবিলায় প্রতিরা স্থাপনা নির্মাণ করে। মার্কিন বাহিনী আফগান তালেবানদের সঙ্গে পাকিস্তানি জঙ্গিদের যোগাযোগ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানলেও তা বন্ধ করতে পারছেনা। সুশাসন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আফগানিস্তানে ১৯৯৪ সালে তালেবানরা একতাবদ্ধ হয়েছিল। তাদের সর্বাতœক সাহায্য করেছিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। আজ পাকিস্তানের তালেবানরাই আইএসআইয়ের নিয়ন্ত্রণে নেই। তাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযান যৌক্তিক। তবে আফগানিস্তানের তালেবানদের সঙ্গে পাকিস্তানের বিরোধ নেই। পাকিস্তান সরকার পশতুনদের মদদ দিয়ে যাচ্ছে।
পাকিস্তানি তালেবানদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অভিযান মূলত অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফসল। আর আফগানিস্তানের অস্থিতিশীলতার কারণ নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে ইসলামাবাদের অদৃশ্য যুদ্ধ। দুই দেশের রাজনৈতিক পর্যায়ে এই যুদ্ধ না থামলে কোনো দিন আফগানিস্তানে শান্তি ফিরবেনা।

বব চার্চার: সাবেক ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা
ভাষান্তর: মেহেদী হাসান

Advertisements

December 11, 2009 - Posted by | International, Peace | , , ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: