My Blog My World

Collection of Online Publications

জলবায়ু: ধনী দেশগুলো যেভাবে কথা রাখতে পারে

জেফরি সাচ
কোপেনহেগেনে জলবায়ু সম্মেলনে ধনী দেশগুলো অবশেষে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তিগ্রস্ত দেশগুলোকে অর্থায়নের ব্যাপারে আলোচনা শুরু করেছে। এই অর্থায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে গত দুই বছর বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হলেও ধনী দেশগুলোর অনীহার কারণে তা সাফল্যের মুখ দেখেনি। এভাবে চলতে পারেনা। জলবায় পরিবর্তনে তিগ্রস্ত দেশগুলোকে অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটা ফর্মূলা থাকা দরকার।
অর্থায়নের বিষয়টি এসেছে ১৯৯২ সালে স্বাক্ষরিত ‘ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ শীর্ষক আইন থেকে। ঐ আইন সুস্পষ্ট। এতে বলা আছে, উন্নত দেশগুলো তাদের দায়বদ্ধতা থেকেই উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থ সাহায্য প্রদান করবে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর যে পরিমাণ অর্থ সাহায্য প্রয়োজন উন্নত দেশগুলো তা প্রদান করবে। মূলত এই অর্থ সাহায্যের উপরই জোর দেয়া হয়েছিল ঐ আইনে। পারস্পরিক আস্থা এবং হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক থাকলে নতুন আইন প্রণয়ন এবং চাহিদা অনুযায়ী উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি এবং অর্থ ছাড়ের জন্য দুই বছরই যথেষ্ট সময় ছিল। অবশ্য তেমন কোনো বৈঠকই হয়নি গত কয়েক বছরে। উন্নত বিশ্বের রাজনৈতিক নেতারা যেমন তাদের দেশের জনগণের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলেননি তেমনি এড়িয়ে চলেছেন দরিদ্র দেশগুলোর নেতৃবৃন্দকেও। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি মার্কিন জনগণের দীর্ঘ প্রতিশ্রুত দায়বদ্ধতার ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকেও কোনো দিন মুখ খুলতে শোনা যায়নি।
ধনী দেশগুলোর নেতৃবৃন্দ তেমন কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে চাননা। আর বিদেশে চাপের মুখে যাওভা দেন তাও আবার পূরণে অনীহা দেখায় তাদের দেশের সংসদ। বৈশ্বিক প্রয়োজন বা আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা- কোনো কিছুই এখানে কাজ করেনি। এটা রাজনীতির চালাকি। তবে এর ফলে বৈশ্বিক সঙ্কট তীব্রতর হচ্ছে। আমি উন্নত দেশগুলোর উন্নয়ন সহযোগিতার প্রতিশ্রুতির মধ্যেও এমনটি দেখেছি। গত সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত গ্রুপ ২০ সম্মেলনে ধনী দেশগুলো আফ্রিকাকে তাদের ২০০৫ সালে দেওয়া প্রতিশ্র“তি পূণর্ব্যক্ত করেছে। ঐ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০০৫ মাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত আফিকাকে বছরে ৩০ বিলিয়ন ডলার করে সাহায্য দেওয়ার কথা রয়েছে। এ বছর শেষ হতে আর তিন সপ্তাহ বাকি থাকলেও ধনী দেশগুলো আফ্রিকাকে এখনো ২০ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দেয়নি। ঐ অর্থ সাহায্য কীভাবে ব্যয় করা হবে তা আমি ২০০৫ সালে মার্কিন সরকারের কাছে জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মার্কিন সরকার আমাকে এ ব্যাপারে কোনো তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। ডেনমার্ক, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ড, নরওয়ে এবং সুইডেনের মতো কয়েকটি দেশ ধারাবাহিকভাবে তাদের অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্র“তি রা করে এসেছে। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার সহযোগিতা হিসেবে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার সহযোগিতা দেওয়ার যে প্রস্তাব করেছে তা অনেকটা লেম্যান শেয়ারের মতো। ঐ প্রস্তাব বা প্রতিশ্র“তিতে কোনো সুস্পষ্ট ফর্মুলা যেমন নেই তেমনি নেই কোনো জবাবদিহিতাও।
এমন প্রেক্ষাপটে কোপেনহেগেন সম্মেলন হলো একটি ভেঙে পড়া ব্যবস্থাকে ঠিকঠাক করার আনুষ্ঠানিকতা। উন্নত দেশগুলো অতীতে বিভিন্ন সময় সাহায্য দিলেও তার বিস্তারিত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। কখনো কোনো স্প্রেডশিটের কথাও শোনা যায়নি। আমাদের এই অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। গত ১১ ডিসেম্বর প্রকাশিত খসড়া চুক্তিতে এমন একটি বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে। যদিও এখনো তা ব্র্যাকেট বন্দি এবং প্রভাবশালী অনেক দেশের এ ব্যাপারে আপত্তি আছে এরপরও তা নিয়ে আশাবাদী আমরা। আমরা চাই, কোন দেশ কী পরিমাণ অর্থ সাহায্য দেবে তার একটা সুস্পষ্ট ভিত্তি ও পরিমাণ থাকুক। আমরা ঐ পরিমাণ সাহায্য প্রদান দেখতে চাই।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সদস্য রাষ্ট্রগুলো আনুপাতিক হারে অর্থ প্রদানে এগিয়ে আসতে পারে। এেেত্র সহায়ক ভুমিকা পালন করতে পারে জাতিসংঘও। এককথায় আমাদের উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অর্থায়নের জন্য সুস্পষ্ট ফর্মুলা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রেত্ ফর্মুলা প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে অর্থ প্রদানের মূল ভিত্তি হবে গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমনের হার। কার্বন নির্গমন বা দূষণকারীরাই অর্থ দেবে- এমন ধারণা থাকতে হবে আমাদের। ফর্মুলা নির্ধারণের প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ। প্রত্যেক দেশ কার্বন দূষণের জন্য আনুপাতিক হারে অর্থ দেবে। আর পুরো পরিকল্পনা যেন বাস্তবায়ন করা যায় তাও আমাদের মনে রাখতে হবে।
দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থ প্রদান করার জন্য উন্নত দেশগুলো কার্বন ট্যাক্স বা কার্বন নির্গমন অনুমোদন নিলামে তুলে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় উন্নত দেশগুলো দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে যেমন অর্থ সাহায্য করতে পারবে তেমনি নিজের দেশেও কার্বন নির্গমন রোধে উদ্যোগ নিতে পারবে। মেক্সিকো, নরওয়ে এবং সুইজারল্যান্ড ইতিমধ্যে কার্বন নির্গমন ভিত্তিক সমীার ভিত্তিতে অর্থ সাহায্য দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
উন্নত দেশগুলো বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন করে। এ কার্বনের মূল উৎস জীবাশ্ম জ্বালানি এবং শিল্পোৎপাদন প্রক্রিয়া। বর্তমান বাজারে প্রতি টন কার্বনের মূল্যের পাঁচ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ তিন ডলার ধরা হলেও উন্নত দেশগুলোকে বছরে ৫০ বিলিয়ন ডলার অর্থ দিতে হবে। অনুন্নত দেশগুলোর জন্য আগামী কয়েক বছর এই অর্থ বেশ প্রয়োজন। চীন এবং আরো কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। আগামী বছরগুলোতে আরো কয়েকটি দেশ এই তালিকায় যুক্ত হবে। এখন দরিদ্র দেশগুলোকে অর্থ সাহায্য প্রদানে মধ্য আয়ের দেশগুলোরও সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। কার্বন নির্গমন এবং প্রয়োজনের ভিত্তিতে সমীক্ষা চালাতে যত বিলম্ব হবে উন্নত বিশ্বের দায় ততই বাড়বে।
এটাও সত্যি আজকের নিম্ন আয়ের দেশগুলো উন্নত দেশগুলোর আর্থিক সহযোগিতায় ভালো অবস্থানে পৌঁছাবে। তখন তারাও কার্বন নির্গমনের সমীক্ষায় যুক্ত হয়ে প্রয়োজনে অন্য দেশগুলোকে অর্থ সাহায্য প্রদান করবে। অর্থাৎ একবার এই সমীক্ষার নীতি চালু করা সম্ভব হলে তা যুগ যুগ ধরে চলবে। বিশ্ব ব্যাংকের সমীক্ষার আদলে এই সমীক্ষা হলে তা গ্রহণযোগ্যতা পাবে।
কোন দেশ কী পরিমাণ কার্বন নির্গমন করে আর এর ফলে কোন দেশ কী পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত- তা নিয়ে সমীক্ষাই হবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অর্থায়ন উদ্যোগ প্রথম পদক্ষেপ। ইউরোপীয় কাউন্সিল সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অর্থ প্রবাহের উপর কর বসানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া উন্নয়ন অর্থায়নের জন্য সমীক্ষা চালানোর প্রস্তাবও দিয়েছে ইউরোপ। এই সমীক্ষা এবং অর্থায়ন যত স্বচ্ছ এবং দতার সঙ্গে করা সম্ভব হবে বিশ্বের জন্য ততই মঙ্গল। পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে আমাদের এমন একটি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। আমরা মনে করি, উন্নত দেশগুলো এর মাধ্যমে সহজেই তাদের প্রতিশ্র“তি পূরণ করতে পারবে। প্রয়োজন কেবল তাদের আন্তরিকতা এবং পৃথিবীকে বাঁচানোর সদিচ্ছা। উন্নত দেশগুলোর কার্বন নির্গমনের ফলে তিগ্রস্ত হচ্ছে অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো। তাই এর তিপূরণ দেওয়ার দায় কোনোভাবেই এড়াবার নয়।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ ইন্সটিটিউটের পরিচালক এবং অর্থনীতিবিদ
ফিনান্সিয়াল টাইমস থেকে ভাষান্তর মেহেদী হাসান

Advertisements

December 18, 2009 - Posted by | Global Warming | ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: