My Blog My World

Collection of Online Publications

জলবায়ু সম্মেলন: পরাজিত হলো গরিব দেশগুলো

জোয়ান হ্যারি

কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলন ঘিরে আমাদের সব প্রত্যাশা ফুরালো। সবচেয়ে বেশি দূষণকারী দেশগুলো সব বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত ও সতর্কবাণীকে আমলে না নিয়ে বছরের পর বছর ধরে বীরদর্পে পৃথিবীকে বিপন্ন করে তুলছিল। এবার তাদের নেতারা কোপেনহেগেনে এসে যেন বললেন, তারা তাদের দূষণ চালিয়ে যাবেন! তারা যে চুক্তি অনুমোদন করছেন, তা আসলে কোনো চুক্তি নয়, সমুদ্রসীমার কাছাকাছি বিশ্বের বিভিন্ন দ্বীপ, হিমবাহ, উত্তর মেরু এবং কোটি কোটি মানুষের কফিনে পেরেক ঠোকা। কোপেনহেগেন সম্মেলনকে অনেকে দেখছেন ‘পরিবর্তন শুরুর শেষ’ হিসেবে।
কোপেনহেগেনে সম্মেলন দেখতে এসে আমরা মোটেও বিস্মিত হইনি। বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে কার্বন নির্গমনের জন্য বিজ্ঞানী, উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশ এবং বিক্ষোভকারীরা প্রতিদিন সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত বিভিন্ন প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। কিন্তু বিভিন্ন অজুহাতে এক এক করে সব প্রস্তাবেই ভেটো দিয়েছেন উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের সরকারগুলোর প্রতিনিধিরা। বাস্তবসম্মত হওয়া সত্ত্বেও যেসব প্রস্তাব আলোচনায় প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, সেগুলোর দিকে আজ দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। বিশ্বনেতারা যখন কোনো কার্যকর সমাধান দিতে পারেননি তখন বিপন্ন পৃথিবীকে রায় আমাদের প্রস্তাব বা দাবিগুলো আমাদেরই বাঁচিয়ে রাখতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ যেসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়েছে সেগুলোর মধ্যে আমি প্রথমে রাখবো আন্তর্জাতিক পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবকে। কোপেনহেগেনে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী কার্বন নির্গমন হ্রাসের বিষয়টি একেবারেই কোনো দেশের ঐচ্ছিক ব্যাপার। কোনো দেশের সরকার যদি তা না মানে তাহলে তা বৈশ্বিক উষ্ণায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে ঠিকই; কিন্তু সমালোচনা বা মৃদু ভর্ৎসনা ছাড়া ‘অপরাধী’ দেশটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া যাবে না। কিয়োটোতে চুক্তি স্বারের জন্য কানাডা কার্বন নির্গমন হ্রাসের অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু দেশটি বাস্তবে কার্বন নির্গমন হ্রাসের পরিবর্তে শতকরা ২৬ ভাগ বাড়িয়েছে। অর্থাৎ কোনো দেশেরই প্রতিশ্র“তি রার কোনো বাধ্যবাধকতা বা দায়বদ্ধতা নেই। কোপেনহেগেন সম্মেলনের পর কানাডার মতো শত শত দেশ তাদের প্রতিশ্রুতি ভাঙতে উৎসাহী হবে।
বলিভিয়ার সাহসী প্রতিনিধিদলটি চুক্তির ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নিজ দেশের হিমবাহ ভয়ঙ্কর মাত্রায় গলার দৃশ্য দেখার পর সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের অবাস্তব কর্মকাণ্ড দেখে তারা চুপ থাকতে পারেননি। বলিভিয়ার প্রতিনিধিদলের সদস্যরা বলেছেন, বিশ্বের সব দেশই এ বিপন্ন পৃথিবী এবং জলবায়ুর সমান অংশীদার। আমাদের দেশগুলো যদি কার্বন নির্গমন হ্রাসের ব্যাপারে আন্তরিক হয়, তাহলে অবশ্যই এমন একটি আন্তর্জাতিক পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা সব দেশের কার্বন নির্গমন রোধের ব্যাপারে তদারকি করবে এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে। যেমন বাণিজ্যের মতো বিষয়ে আমাদের কর্পোরেট লবি এবং নেতারা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে ছাড় দিয়েছে। কোনো দেশ কপিরাইট আইন কঠোরভাবে অনুসরণ না করলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং বিপুল অর্থ জরিমানা করে থাকে। বিশ্বনেতাদের কাছে নিরাপদ জলবায়ু কি তবে ট্রেড মার্কের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াল?
প্রত্যাখ্যাত প্রস্তাবের তালিকায় আমার কাছে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জীবাশ্ম জ্বালানিকে মাটির তলায় রাখা। পরিবেশবাদী লেখক জর্জ মনবিয়ট এবং ফ্রেন্ডস অব দি আর্থ সংগঠনের চেয়ারম্যান নিমো ব্যাসি সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের পরস্পরবিরোধী আচরণের বিষয়টি তুলে ধরেন। তারা অভিযোগ করেন, বিশ্বনেতারা মুখে বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণ ব্যাপক হারে কমানো প্রয়োজন। অন্যদিকে তারা ধারাবাহিকভাবে খনিজ সম্পদ উত্তোলন এবং অনুসন্ধান করে চলছেন। এক হাতে তারা বিশ্বের বুকে আগুন ধরাচ্ছেন আরেক হাত দিয়ে যেন আগুন নেভানোর যন্ত্র ধরে আছেন। একসঙ্গে দুটি কোনো দিন চলতে পারে না।
এ বছরের প্রথম দিকে ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাপক হারে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধ করতে হলে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত তেল, কয়লা ও গ্যাসের মজুদের ৬০ শতাংশ ব্যবহার করতে হবে। তাই জলবায়ু পরিবর্তন রোধ বিষয়ক যেকোনো চুক্তির প্রথমেই এমন বিধান থাকতে হবে, যাতে নতুন করে আর কোনো জীবাশ্ম জ্বালানির অনুসন্ধান করা হবে না এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আবিষ্কৃত মজুদের কোন কোনটি ব্যবহার করা হবে না। নিমো ব্যাসি বলেছিলেন, ‘ভূগর্ভস্থ তেল, কয়লা ও গ্যাস ভূগর্ভেই থাকতে দিন।’ আমাদের নেতারা এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনাই করেননি।
আমার কাছে প্রত্যাখ্যাত তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জলবায়ু ঋণ। উষ্ণায়ন বৃদ্ধিতে সহায়ক গ্যাস নির্গমনের ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ দায় ধনী দেশগুলোর। অথচ এর ৭০ শতাংশ প্রভাব পড়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। বন্যা ঠেকাতে হল্যান্ডের মতো দেশের সমুদ্রসীমা বরাবর বিশাল বাঁধ তৈরির আর্থিক মতা আছে। তবে অর্থাভাবে ডুবতে হবে বাংলাদেশের মতো দেশকে। বিশ্বে দায় ও প্রভাবের সমীকরণ বড় নিষ্ঠুর। উন্নত বিশ্বের কার্বন নির্গমনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় উন্নয়নশীল বিশ্ব। অথচ কিছুটা দায় শোধেরও যেন কোনো তাড়না নেই। তাই তো আমাদের বিশ্বনেতারা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়ক তহবিল গঠন বা অর্থ সাহায্যের প্রস্তাব আলোচনার টেবিল থেকে বাইরে ছুড়ে ফেলেছিলেন। প্রধান আলোচক নাউমি কেইন বলেছেন, যে পরিমাণ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি মিলেছে তাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সম্ভাব্য মৃত্যুবরণকারী সব মানুষের কফিনও মিলবে না। কার্বনসমৃদ্ধ নিশ্বাস পরিবেশবাদকে গিলে খাচ্ছে। তাই তো নাওমি বলেছেন, ‘এই সম্মেলনে পরিবেশবাদের মেরু উত্তর থেকে দক্ষিণে স্থানান্তরিত হলো।’
যখন আমরা সম্মেলনের টেবিলে আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করছি, কোন দেশ কী পরিমাণ কার্বন নির্গমন করতে পারবে তখন এটিও প্রত্যাখ্যাত হলো উন্নত দেশগুলোর কাছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা তহবিলের কর্তৃত্ব অন্যের হাতে ছাড়তে রাজি নয়। আমরা কিভাবে এমন চুক্তি মেনে নেব, যে চুক্তিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না? ধনী দেশগুলো যেসব বিষয় মেনে চলতে প্রত্যাখ্যান করে সেগুলো মেনে চলতে কেন গরিব বা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বাধ্য করা হবে? বিশ্বের সব দেশকে সমান মর্যাদা দিয়ে আলোচনার টেবিলে বসানো হলে জলবায়ুকে শীতল করতে সহায়ক চুক্তি করা সম্ভব হতো। কোপেনহেগেনে উন্নত বিশ্বের সহায়তায় কার্বন ব্যবসায়ীরাই জয়ী হলো। পরাজিত হলো উন্নয়নশীল ও গরিব দেশগুলো। সত্যিকারের সমাধান যারা ‘অবাস্তব’ বলেন তাদের যুক্তি হলো, এ পৃথিবীর প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ভয়াবহভাবে ভেঙে পড়ার পরও সভ্যতা এগিয়ে চলেছে। তাদের এ যুক্তি আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি দেশগুলো তাদের জনগণের জীবন বাঁচাতে বাস্তবসম্মত সমাধানের প্রত্যাশায় ছিল সম্মেলনের পুরোটা সময়। তাদের শান্ত, বিষন্ন মুখে নিজেদের সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে আলোচনা করতে দেখা গেছে। তাদের সব প্রচেষ্টা, বিজ্ঞান, বিজ্ঞানীদের হুশিয়ারি এবং সর্বোপরি নিরীহ নিরপরাধ মানুষকে বাঁচানোর আকুতিÑসবই বিফলে গেল ওই ধনী দেশগুলোর সামনে।
আরো কয়েক ডজন প্রত্যাখ্যাত প্রস্তাব আমার মধ্যে এ বিশ্বাসই দৃঢ় করছে, মানুষের কারণে এ উষ্ণায়ন কখনোই থামানো যাবে না। বিপন্ন পৃথিবীকে বাঁচানোর প্রস্তাব শুধু কাগজেই থেকে যাবে। হ্যাঁ, ধনী দেশগুলোর নেতারা ছাড় দেবেন। তবে তা তাদের অভিভাবকদের চেয়ে কম। পুনরায় ব্যবহারযোগ্য জ্বালানিনির্ভর পৃথিবী গড়তে আমাদের বাড়তি কর দিতে হবে এবং কম বিমান চালাতে হবে। তাহলেও হয়তো আমরা এ উষ্ণ পৃথিবীতে বাস করতে পারব। তবে সবচেয়ে বড় লোকসানের মুখে পড়বে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবসায়ীরা। না, আমাদের নেতারা এমন পথ বেছে নেননি। এখনো চলছে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের প্রতিযোগিতা। কোপেনহেগেন সম্মেলনে জীবন বাঁচাতে সহায়ক নতুন কিছু প্রস্তাব উঠলেও গৃহীত হলো না। ধনী দেশগুলো গরিব, উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাঁচার অধিকার রাখল না।
লেখক: সাংবাদিক
লন্ডন ইন্ডিপেনডেন্ট থেকে ভাষান্তর: মেহেদী হাসান

Advertisements

December 20, 2009 - Posted by | Global Warming | , ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: