My Blog My World

Collection of Online Publications

বৈশ্বিক উষ্ণতা, ব্যর্থ রাষ্ট্র ও সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি

কলিন জে ফেমিং
‘বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে আমাদের সন্তানদের জীবদ্দশায়ই বিশ্বজুড়ে যে খরা, ঝড় ও তাপদাহের খড়গ নেমে আসবে তার প্রমাণ দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এমন বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে যে, তা মাত্রার বিচারে যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শীতল যুদ্ধকাল বা আজকের পরমাণু অস্ত্রের প্রতিযোগিতার ভয়াবহতাকেও হার মানবে।’ জলবায়ু ও সংঘাত বিষয়ে বর্তমান বিশ্বের প্রথম সারির বিশেষজ্ঞ থমাস হোমার-ডিক্সনের এমন বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন আটলান্টিক পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ রবার্ট ডি কাপলান। তিনি বলেছেন, পরিবেশ যে একুশ শতকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে তা এখনই বোঝা উচিত।
সমাধানের আশাভঙ্গ: কোপেনহেগেন সম্মেলনে বিশ্বনেতৃবৃন্দের কোনো যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছানোর ব্যর্থতা বিশ্বের সবচেয়ে আশাবাদী ব্যক্তিদের মধ্যেও নিরাশার জš§ দিয়েছে। সুইডেনের পরিবেশমন্ত্রী আন্দ্রে কার্লগ্রেন কোপেনহেগেনের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সম্মেলনকে ‘ভয়াবহ ভুল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সম্মেলন শেষে বিশ্ব এমন এক সমঝোতার ঘোষণা পেল, যা মেনে চলা না-চলা দেশগুলোর জন্য কেবলই ঐচ্ছিক ব্যাপার। এর অর্থ হলো, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার ব্যর্থতায় যা হওয়ার কথা ছিল তা অবশ্যম্ভাবী ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। বিশ্বের বিভিন্ন অংশে প্রবল বন্যা, ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, অপ্রতিরোধ্য সংঘাতই শেষ পরিণতি নয়। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় সামরিক থিঙ্কট্যাঙ্কের আশঙ্কা যদি ভুল প্রমাণ না হয় তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ২১ শতকে মার্কিন নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বিশ্বে ব্যর্থ রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়বে। বাড়বে সন্ত্রাস। আর এটি বিশ্বে নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
ভেঙে পড়বে রাষ্ট্রব্যবস্থা: ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অন কাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) চেয়ারম্যান ড. আর কে পাচৌরি ২০০৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্ব যদি কিছুই না করে তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। তাপদাহ আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়বে। কমবে সুপেয় পানির পরিমাণ। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে বিশ্বে খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায়। মার্কিন মিলিটারি থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর নেভাল অ্যানালাইসিসের (সিএনএ) ‘জাতীয় নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট হুমকি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদন ১০ শতাংশ হ্রাস পাবে। ভারতীয় উপমহাদেশ এবং আফ্রিকায় খাদ্য উৎপাদন সবচেয়ে কমবে।
বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি দেখা দেবে প্রবল বন্যা। কার্ট ক্যাম্পবেল তার সম্পাদিত ‘কাইমেটিক ক্যাটাকিজম’ গ্রন্থে লিখেছেন, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বসবায় সমুদ্রসীমা থেকে ভূখণ্ডের ৬০ কিলোমিটারের (প্রায় ৩৭ মাইল) মধ্যে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে উন্নয়নশীল দেশের কয়েক শ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ক্রিশ্চিয়ান এইড এবং আরো কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের ১০০ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। আর প্রবল বন্যায় বিশ্বের শহরে শহরে দেখা দেবে বিশুদ্ধ পানির সংকট। সিএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রবল বৃষ্টি, তুষারপাত, বরফ ও হিমবাহ গলার হার বাড়বে। এসবের বিরূপ প্রভাব পড়বে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। চরম পানি সংকটে পড়বে মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা মহাদেশের উত্তরাঞ্চলের দেশগুলো। আন্তর্জাতিক পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে পাকিস্তান, দণি আফ্রিকা, চীন এবং ভারতের বড় একটি অংশে পানির অভাব দেখা দেবে।
সিএনএর প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং পানীয়জলের অভাবে নানা ধরনের ভেক্টর-বোন, পানি ও খাদ্যবাহিত রোগ হতে পারে। নিউইয়র্কের ওয়েস্টপয়েন্টের অধ্যাপক এলটিসি লুইস রায়োস বলেছেন, খাদ্যশস্য উৎপাদনে ব্যর্থতা এবং পানি সংকটের মতো পরিবেশগত সমস্যার কারণে রাষ্ট্রব্যবস্থা ব্যর্থ হওয়ার বড় ঝুঁকি রয়েছে। সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট শ্যারন বার্ক ‘কাইমেটিক ক্যাটাকিজম’ গ্রন্থে এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ দিয়ে লিখেছেন, বিশ্বের সবচেয়ে বিত্তশালী দেশটির নিউ অরলিন্সে হ্যারিকেন ক্যাটরিনার পর কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হলেও আজও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসেনি।
সন্ত্রাসবাদের উত্থান: সিএনএর প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, যখন কোনো রাষ্ট্র তার জনগণের প্রাপ্য সেবা ও সুবিধা, রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত এবং নিজের সীমানা রা করতে পারে না তখন সে রাষ্ট্রে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি বাড়ে। আর ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলোই বিশ্বে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী নিয়ামকগুলোর চারণভূমি হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যর্থ হলে নিরীহ মানুষদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বা জঙ্গি-সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে প্ররোচিত করা সহজ বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন আর্মি ওয়ার কলেজের ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইস্যুজ গ্রুপের পরিচালক ড. কেন্ট বুটস। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী না হয়েও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এর প্রভাব মোকাবিলা করতে বাধ্য হওয়ায় মার্কিনবিরোধী মনোভাব তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন ২০০৭ সালে এক ভিডিও টেপে পরিবেশ দূষণের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর দুর্ভোগ সৃষ্টির জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর নিন্দা করেছিলেন। অধ্যাপক নোয়াম চমস্কিও সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে বারবার বলেছেন, ভয়, হতাশা, ক্ষোভ এবং বেপরোয়া মনোভাব থেকেই সন্ত্রাসবাদের  জন্ম। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় উদ্যোগ নেওয়া না হলে আগামীতে বারবার এসবের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে।
বিশ্বের ভবিষ্যৎ সোমালিয়া:  ‘কাইমেটিক ক্যাটাকিজম’ গ্রন্থে বার্ক তাঁর নিবন্ধে সতর্ক করে বলেছেন, নিউ অরলিন্স যদি আমাদের ভবিষ্যতের একটি উদাহরণ হয়, আরেকটি উদাহরণ হবে সোমালিয়া। খরা, দুর্ভি আর সংঘাতময় পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতায় সন্ত্রাসীরা যেন সোমালিয়াকে অঞ্চলভিত্তিক ভাগ করে নিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সারা বিশ্বের অবস্থাই সোমালিয়ার মতো হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন কেবল যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই নয়, সারা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্যই বড় হুমকি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বে ব্যর্থ রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়বে। জীবন-জীবিকার তাগিদে বাস্তুহারা মানুষ দল বেঁধে অন্যত্র পাড়ি জমাবে। সঙ্গে যাবে রোগব্যাধি, সমস্যা। বাড়বে সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি।
লেখক: কানাডার সাংবাদিক ও নাট্যকার
সংক্ষেপিত ভাষান্তর: মেহেদী হাসান

Advertisements

January 22, 2010 - Posted by | Foreign Affairs, Global Warming, Peace, Political |

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: