My Blog My World

Collection of Online Publications

শ্রীলঙ্কার নির্বাচন ও গণমাধ্যমকর্মীদের ভবিষ্যৎ

বব ডিয়েটজ
সিপিজে ব্লগ থেকে ভাষান্তর : মেহেদী হাসান
এই নিবন্ধটি দৈনিক কালের কণ্ঠে ২৯ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে প্রকাশিত হয়েছে।

শ্রীলঙ্কার নির্বাচন কমিশন ক্ষমতাসীন মাহিন্দা রাজাপাকসেকে প্রেসিডেন্ট পদে বিজয়ী ঘোষণা করেছে। তিনি প্রায় ৫৮ শতাংশ ভোট পেলেও শ্রীলঙ্কার রাজনীতি নিয়ে শঙ্কা কাটেনি। রাজাপাকসের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক জেনারেল সরত ফনসেকা নির্বাচন নিয়ে মামলা করার হুমকি দিয়েছেন। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সুযোগ থেকে শুরু করে ভোট গণনা_প্রায় প্রতিটি পর্যায় নিয়েই তাঁর আপত্তি। ভোটের পর ফনসেকা অবস্থান নিয়েছিলেন কলম্বোর সিন্যামন লেকসাইড হোটেলে। এখানে তাঁর শরিক দলের নেতারাও জড়ো হয়েছিলেন, সাজিয়েছিলেন ফলাফলের টালি। শ্রীলঙ্কার কয়েকটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ফনসেকা দাবি করছেন, তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরপরই শ্রীলঙ্কার নির্বাচন কমিশনার দয়ানন্দ দিশানায়েক পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। দয়ানন্দ সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের চাপের বোঝা তিনি আর বহন করতে পারছেন না।
চরম শঙ্কা আছে গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যেও। নির্বাচনী প্রচারণার সময় সংবাদমাধ্যমগুলো কমবেশি রাজাপাকসে বা ফনসেকার পক্ষ নিয়েছিল। নিরপেক্ষভাবে প্রার্থীদের খবর পরিবেশনের বিষয়টি খুব কমই দেখা গেছে। রাজাপাকসেবিরোধীরা অভিযোগ করেছেন, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম অন্ধভাবে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুণগান গেয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে আমরা কয়েকটি অনলাইন প্রকাশনার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ এবং একজন সাংবাদিকের ওপর হামলার প্রমাণ পেয়েছি। শ্রীলঙ্কার অন্যতম নিউজ ওয়েবসাইট লঙ্কাইনিউজের রাজনৈতিক প্রতিবেদক ও ফনসেকাপন্থী সাংবাদিক প্রগৃথ একনেলিগোরা গত ২৪ জানুয়ারি থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। তিনি নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর শ্রীলঙ্কার আরেকজন সাংবাদিক আমাকে লিখেছিলেন, ‘আমার ধারণা, একনেলিগোরাকে অপহরণ করা হয়েছে।’ গত মঙ্গলবার আমরা জেনেছি, ভোট শুরুর প্রাক্কালে সরকারের নির্দেশে কয়েকটি ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বিলম্বে হলেও আমি শ্রীলঙ্কার কয়েকজন সাংবাদিক এবং আরো কয়েকটি সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছি। তাদের বেশির ভাগের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে ফোনে এসএমএস পাঠিয়ে কিংবা সামাজিক নেটওয়ার্কিং সাইট টুইটারে পাঠানো বার্তার মাধ্যমে। এখানে একজন সাংবাদিক একটি বার্তা পাঠিয়েছেন, যা বছরের পর বছর শ্রীলঙ্কার অবস্থা দেখে বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছি। (তিনি আরো হুমকির সম্মুখীন হতে পারেন_এ আশঙ্কায় আমি তাঁর নাম প্রকাশ করছি না)। ‘বিপুলসংখ্যক মানুষের বিশ্বাস, ভোট গণনায় কারচুপি হয়েছে। ফনসেকার সঙ্গে রাজাপাকসের ব্যবধান অনেক বেশি দেখানো হয়েছে। নির্বাচনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে এবং রাজাপাকসের প্রতিপক্ষ, এমনকি প্রতিপক্ষকে সমর্থন দানকারী গণমাধ্যমগুলোও প্রতিহিংসার শিকার হতে পারে।’ শ্রীলঙ্কার যেসব সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করছি, তাদের অনেকের মনেই আজ এমন শঙ্কা। নির্বাচনে কি তবে শ্রীলঙ্কার গণমাধ্যমকর্মীদের শাস্তির পক্ষেই রায় হলো?
ভালো-মন্দ দুই ধরনের ইঙ্গিত আছে বর্তমান শ্রীলঙ্কায়। স্বশাসনের দাবিতে আন্দোলনকারী তামিলদের বিরুদ্ধে কয়েক দশকের যুদ্ধ গত বছর শেষ হয়েছে। যুদ্ধ শেষ হলেও অনেক তামিলের দুর্দশা শেষ হয়নি। ভোট অনুষ্ঠিত হলেও আইনি বাধা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। শ্রীলঙ্কা মারাত্দক অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। এর কারণ দুইটি_ একটি যুদ্ধ এবং অপরটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা। পাঁচ বছর ধরে সরকারের মধ্যে যে দমনমূলক আচরণ ছিল, বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক চাপের কারণে তা বদলাতে শুরু করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন শ্রীলঙ্কার সঙ্গে প্রেফারেন্সিয়াল ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ চুক্তি সুবিধা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওয়াশিংটনের ওবামা প্রশাসনকে শ্রীলঙ্কার মতো দেশের ব্যাপারে তুলনামূলক কম সংঘাতপূর্ণ নীতির পক্ষেই মনে হচ্ছে। শ্রীলঙ্কার বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখনো ইতিবাচক মনোভাব থাকায় পুঁজিবাজারে সূচক বাড়ছে। তবে নির্বাচনী প্রচারণার সময় টেলিভিশনে রাজনৈতিক আলোচনা অনুষ্ঠানে পদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতি উদ্বেগজনক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাঁদের একজন সহকর্মী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ কারণে তাঁরা ওই অনুষ্ঠানগুলোতে আসেননি। ৬১ বছরের ইতিহাসে কোনো সামরিক অভ্যুত্থান না ঘটলেও বর্তমানে সামরিক বাহিনীতে রাজনীতি এমন মাত্রায় ঢুকেছে যে, বিশ্লেষক হিসেবে অনুষ্ঠানে পদস্থ সেনা কর্মকর্তাদের ডাক পড়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় ব্যক্তি বা দলের প্রতি সংবাদমাধ্যমের যে আনুগত্য প্রকাশ পেয়েছে, শ্রীলঙ্কার জন্য তা নতুন কিছু নয়। এটা এ দেশে কয়েক দশকের পুরনো গণমাধ্যম সংস্কৃতি, ঔপনিবেশিক মানসিকতা এবং সংসদীয় সরকারব্যবস্থার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিঃসন্দেহে রাজাপাকসের সরকার শিখতে পারবে, প্রতিপক্ষের গণমাধ্যমকে মোকাবিলা করে কিভাবে টিকে থাকতে হবে। তামিলদের বিরুদ্ধে রাজাপাকসে প্রশাসনের সর্বাত্দক যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা শুরু হয়। সেই সময় তদন্ত করা যায়নি_এমন কিছু অভিযোগের দলিল আমাদের কাছে আছে। রাজাপাকসের সরকার অতীতের সাংবাদিক নিপীড়নের ইতিহাসকে পাল্টে দিতে পারে।
আমি যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁদের কেউই বলতে পারেননি, আগামী দিনগুলোতে কী ঘটতে যাচ্ছে। সবাই না হলেও অনেকে তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। কেউ কেউ আবার গা-ঢাকা দিয়েছেন। আর সরকারপন্থী গণমাধ্যমের সাংবাদিকরাও দুশ্চিন্তার মধ্যে ভবিষ্যৎ দেখার প্রতীক্ষায় আছেন।
লেখক : কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টের (সিপিজে) এশিয়া প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর
সিপিজে ব্লগ থেকে ভাষান্তর : মেহেদী হাসান

Advertisements

January 29, 2010 - Posted by | Foreign Affairs, International, Media, Political | , ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: