My Blog My World

Collection of Online Publications

আশা ও হতাশা : মার্টিন লুথার কিং, বারাক ওবামা এবং যুদ্ধ

এই নিবন্ধটি দৈনিক কালের কণ্ঠে ৩০ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে প্রকাশিত হয়েছে।

মিডিয়া বেঞ্জামিন

ভাষান্তর : মেহেদী হাসান

ওয়াশিংটন ডিসিতে লিংকন ও জেফারসনের সমাধিসৌধের মাঝের টাইডাল বেসিনে মার্টিন লুথার কিংয়ের সমাধিসৌধের নির্মাণকাজ আগামী বছর শেষ হওয়ার কথা। ১৯৯৬ সালে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন এই সমাধিসৌধ নির্মাণের বিষয়টি অনুমোদন করেন। ২০০৬ সালে সৌধ নির্মাণ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট বুশের সঙ্গে সিনেটর বারাক ওবামাও উপস্থিত ছিলেন। সমাধিসৌধে লুথার কিংয়ের বিশাল আকারের একটি আবক্ষমূর্তির পাশাপাশি আছে বড় দুটি পাথর। এর একটি হতাশা, অপরটি আশার প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।

সিনেটর বারাক ওবামা ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন এবং এক বছরের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ওবামা তাঁর জাতিকে ড. কিংয়ের স্বপ্নের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। এ সময়টায় তিনি স্বপ্ন পূরণের পথে বাস্তবতার মুখোমুখি হবেন। কিংয়ের সমাধিসৌধের মতো তারও আশা ও হতাশার বিষয় হয়তো থাকবে। ওবামা তাঁর বক্তব্যে কূটনীতি, বৈশ্বিক সহযোগিতা, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে পুনরায় সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান দেখানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে নিঃসন্দেহে বিশ্বকে আশাবাদী করে তুলেছেন। তবে তাঁর কাজের ভাষা ভিন্ন। তিনি বন্দি নির্যাতন বন্ধ এবং গুয়ান্তানামো বে বন্দিশিবির বন্ধ করার অঙ্গীকার করেছিলেন। আর সেই অসাধারণ প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও এখনো গুয়ান্তানামো বে বন্দিশিবির সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি। অনির্দিষ্টকালের জন্য ছয় শরও বেশি বন্দিকে আটকে রাখা হয়েছে আফগানিস্তানের বাগরাম ঘাঁটির কারাগারে। বন্দিদের অনেককে ছয় বছরেরও বেশি বন্দি রাখা হলেও কোনো অভিযোগ আনা হয়নি, বিচারকাজও শুরু করা যায়নি। ওবামা মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া শুরুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বসতি নির্মাণ প্রক্রিয়া স্থগিত করার ব্যাপারে ইসরায়েল সরকারের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায়ের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ইসরায়েল তাতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি ইসায়েলেরই পক্ষ নিয়েছিলেন। উপরন্তু তিনি কোনো শর্ত ছাড়াই ইসরায়েলের জন্য ৩০ বিলিয়ন ডলার সাহায্য প্রদান অনুমোদন করেন। এছাড়া তিনি গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা তদন্তের আহ্বান জানানো গোল্ডস্টোন প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হামাস সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

ইরাক ইস্যুতে ওবামা প্রশাসন ২০১০ সালের ৩১ আগস্টের মধ্যে মার্কিন পোশাকধারী সব সৈন্য এবং ২০১১ সালের মধ্যে সব সৈন্য প্রত্যাহারের সময় ঘোষণা করায় অধিকাংশ মার্কিন জনগণের সমর্থন পেয়েছেন। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে ইরাক সফরকালে বলেছেন, বিমানবাহিনীর উপদেষ্টারা সম্ভবত ২০১১ সালের পরও থাকবেন। এছাড়া ইরাকে বেসরকারি মার্কিন ঠিকাদারদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারেও কেউ কোনো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না। তবে আফগানিস্তানে যুদ্ধের ব্যাপকতা এবং পাকিস্তানের জঙ্গিবাদে হতাশ হয়ে ওবামা প্রশাসনের মধ্যে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে।

সামরিক মানসিকতা মোকাবিলায় মার্টিন লুথার কিং মূল্যবোধের বিপ্লব ঘটানোর কথা বলেছিলেন। ১৯৬৭ সালের ৪ এপ্রিল তিনি তাঁর বক্তব্যে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বোমার আঘাতে মানবতাকে পোড়াতে গিয়ে আমরা আমাদের দেশকে অনাথ, বিধবায় ভরে তুলছি। মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষগুলোকে অন্ধকার, রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী করে তোলা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কোনো দিন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। মার্টিন লুথার কিংয়ের ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা করার কারণগুলো প্রেসিডেন্ট ওবামা ভেবে দেখতে পারেন।

কিং দেখেছিলেন প্রেসিডেন্ট জনসনের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ সবার জন্যই আদর্শ প্রতিশ্রুতি হিসেবে। তার মত ছিল, ভিয়েতনাম পুনর্গঠন করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি ভেস্তে যাচ্ছিল। কিং বলেন, ‘আমি জানতাম, আমেরিকা কখনোই দারিদ্র্য বিমোচনে প্রয়োজনীয় তহবিল বরাদ্দ করবে না।’ স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে সবুজায়ন_ওবামার প্রতিশ্রুতি পূরণে কয়েক শ বিলিয়ন ডলার অর্থ প্রয়োজন। ২০০৯ সাল পর্যন্ত ইরাক ও আফগানিস্তানের জন্য এক ট্রিলিয়ন ডলার বরাদ্দ অনুমোদন করেছে মার্কিন কংগ্রেস। ওবামা প্রশাসন শিগগিরই আরো ৩৩ বিলিয়ন ডলার চাইবে। আর্থিক সঙ্কটময় এই সময়ে পেন্টাগনের বাজেট যতই বড় হবে, অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় ওবামার ব্যয়ের গণ্ডি ততই সংকুচিত হবে।

মার্কিন সৈন্যদের মৃত্যু এবং সশস্ত্র বাহিনীতে দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের আধিক্যের কারণে লুথার কিং উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে হাজার মাইল দূরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জনগণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কালো বর্ণের মার্কিন সৈন্যদের সেখানে পাঠানো হচ্ছে। আজ যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর জন্য সৈন্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের প্রাধান্য দেওয়া হয়।

ভিয়েতনামের জনগণের দুর্দশা বুঝতে পেরে কিং ওই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি ভিয়েতনামের জনগণের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছিলেন। তাদের মতো আফগানরাও তিন দশক ধরে যুদ্ধের অভিশাপ বয়ে চলছে। কিং বলেছিলেন, আমি এবারে নিশ্চিত যে, ভিয়েতনামের জনগণের কান্না না শুনলে এবং তাদের সমস্যা সমাধানে কোনো উদ্যোগ নেওয়া না হলে, অর্থবহ কোনো সমাধানে পেঁৗছানো যাবে না। সেই তুলনায় বর্তমানে নিরীহ আফগান জনগণের দুর্দশার চিত্র আরো ভয়াবহ। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে আফগানিস্তানে জাতিসংঘ মিশন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০০৯ সালে হতাহত বেসামরিক আফগান নাগরিকের সংখ্যা ২০০১ সালের তালেবান শাসনামলের চেয়েও বেশি। সামরিক ঘাঁটি ও বিমান থেকে হামলায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পাকিস্তানের ডন পত্রিকার তথ্যানুয়ায়ী, ২০০৯ সালে মার্কিন বিমান থেকে ৪৪ বার পাকিস্তানে হামলা চালানো হয়েছে। এতে নিহত ৭০৮ জনের মধ্যে অধিকাংশ বেসামরিক নাগরিক। এসব হামলার ফলে আন্তর্জাতিক আইন যেমন লঙ্ঘিত হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে আল কায়েদার প্রতি সমর্থন।

নিজ দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকেই কিং যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন। ১৯৬৪ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর মার্টিন লুথার কিং মনে করেছিলেন, তাঁর ওপর দায়দায়িত্বের বোঝা আরো বেড়েছে। পুরস্কার পাওয়ার খবরের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছিলেন, বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় তিনি যে কাজ করেছেন, পুরস্কার পাওয়ার পর তাঁর দায়িত্ব আরো বেড়েছে। গত বছর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করার সময় মার্টিন লুথার কিংয়ের সংঘাতহীন নীতির ব্যাপারে তাঁর সমর্থন ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষার শপথ নিয়েছেন। আমাদের সবাইকে এই কঠিন সত্য স্বীকার করতে হবে বলে তিনি জানান। ওবামা হয়তো যুক্তি দেখাবেন, মার্টিন লুথার কিং কেবল স্বপ্নই দেখেছেন, কোনো দিন সরকার চালাননি। ২০১১ সালে লুথার কিংয়ের সমাধিসৌধ যখন উদ্বোধন করা হবে, তখন ইরাক থেকে মার্কিন সৈন্যদের ফেরার কথা। ওবামার ভবিষ্যৎ সমাধিসৌধেও কিংয়ের সমাধিসৌধের মতো আশা-হতাশার পাথর বসাতে হবে কি না তা হয়তো আগামী বছরই নির্ধারিত হয়ে যাবে।

লেখক : কোডপিঙ্ক-উইমেন ফর পিসের সহকারী প্রতিষ্ঠাতা

‘অল্টারনেট’ থেকে নেওয়া। ভাষান্তর : মেহেদী হাসান

Advertisements

January 30, 2010 - Posted by | Foreign Affairs, International, Political | , , ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: