My Blog My World

Collection of Online Publications

বাংলাদেশ ও ভারতের নতুন অধ্যায়

কুলদীপ নায়ার

ভাষান্তর: মেহেদী হাসান

নিবন্ধটি ৬ ফেব্রুয়ারি দৈনিক কালের কণ্ঠের উপসম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছে। কালের কণ্ঠে নিবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন

গত মাসে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরিত যৌথ ইশতেহার কখন ও কিভাবে বাস্তায়িত হবে_এখন সেদিকেই দৃষ্টি বাংলাদেশের সব নাগরিকের। স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে অনেক প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করায় ভারতের বিষয়ে বাংলাদেশ অখুশি হয়েছে। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত যৌথ ইশতেহারের ব্যাপারে বিভিন্ন মাধ্যমের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে আমি জেনেছি, তারা ওই ইশতেহারকে দুই দেশের জনগণের বিজয় হিসেবে দেখছেন। একজন সম্পাদক মন্তব্য করেছেন, ‘বাংলাদেশ ভারতের প্রতি তার সব ধরনের আস্থার প্রমাণ দিয়েছে। এর পরও যদি দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ঘোলাটে হয়, তবে এর দায় ভারতের ওপরই বর্তাবে।’ ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ভারতকে ছয় মাস সময় দিতে আগ্রহী ছিল। ভারতীয় আমলারা ফাইলপত্র নিয়ে বসলেই ওই ইশতেহার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে। ইতিবাচক বোধ নেতিবাচক মনোভাব দূর করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লড়াই করে জঙ্গিবাদকে পরাজিত করেছেন। নানা উগ্রগোষ্ঠীর উত্থানের সম্ভাবনার সময়ে তিনি নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। ভারতের সঙ্গে তিনি কতটুকু সম্পর্ক উন্নয়ন করতে পেরেছেন, তার পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে পানি। শেখ হাসিনার ভারত সফরের আগে বাংলাদেশ প্রত্যাশা করেছিল, বাংলাদেশে প্রবাহিত নদীগুলোর পানিপ্রবাহে ঢাকার সম্মতি ছাড়া বাধা সৃষ্টি না করার মতো উদারতা দেখাবে ভারত। প্রত্যাশার পর এখন বাংলাদেশিরা অনুধাবন করছে, ভারত তিস্তা নদীর ওপর বাঁধ বা পানি প্রত্যাহার-জাতীয় এমন কোনো কিছু করবে না, যাতে বাংলাদেশে পানিপ্রবাহ বিঘি্নত হতে পারে। যৌথ ইশতেহার খুব স্পষ্ট নয়। কেননা এতে কেবল বলা হয়েছে, তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে আলোচনা শেষ হলে তা দ্রুত কার্যকর করা হবে। দীর্ঘ সাত বছর পর আগামী মার্চ মাসে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশে সম্ভাব্য বিরূপ প্রভাব সৃষ্টিকারী টিপাইমুখ প্রকল্প বাস্তবায়ন না করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঘোষণাই বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট হওয়া দরকার ছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদলকে টিপাইমুখ বাঁধ এলাকাও পরিদর্শন করতে দিয়েছেন। এর পরও বাংলাদেশের জনগণ টিপাইমুখ নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে আমার মনে হয়েছে। বাংলাদেশ এবং ভারতের সম্পর্কের আরেক যন্ত্রণাময় ইস্যু হলো বাণিজ্য। বাণিজ্য ভারসাম্য ভারতের দিকে ঝুলে আছে। অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যকে হিসাবে ধরা হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৬০০ কোটি ডলার হতে পারে। সত্যিকার অর্থেই নয়াদিলি্ল ৪৭টি পণ্যের শুল্ক প্রত্যাহার করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের আয় এক থেকে দেড় কোটি ডলারের বেশি বাড়বে না। বিরোধী লবির আপত্তি সত্ত্বেও ভারত যদি বাংলাদেশে উৎপাদিত সব পণ্যের জন্য শূন্য শুল্ক সুবিধা দিত, তবে তা দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের নিদর্শন হয়ে থাকত। বাংলাদেশের উচিত ছিল আরো আগেই ভারতকে চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর সুবিধা দেওয়া। এ কাজটি করার মাধ্যমে শেখ হাসিনা সাহস দেখিয়েছেন। এতে বাংলাদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়বে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে ভারতের যোগাযোগের দূরত্ব কমবে, সময়ও বাঁচবে। এর বিনিময়ে বাংলাদেশ ভারতের মাটি ব্যবহার করে নেপাল এবং ভুটানের সঙ্গে যোগাযোগসুবিধা পেয়েছে। নেপাল এবং ভুটান বাংলাদেশের সঙ্গে অবাধ যোগাযোগের সুযোগ চেয়ে আসছিল। তবে নয়াদিলি্লর এ ব্যাপারে অনীহা ছিল। শেখ হাসিনা যৌথ ইশতেহারে উল্লেখ করেছেন, তিনি তাঁর দেশের (বাংলাদেশ) মাটিকে জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ডে ব্যবহার হতে দেবেন না। বাংলাদেশ বিশেষ করে শেখ হাসিনার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই। অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি বলেছেন, ‘পাকিস্তানের ভূখণ্ড ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না_এমন আশ্বাস ইসলামাবাদ নয়াদিলি্লকে কিভাবে দেবে?’ তবে ইসলামাবাদ এমন আভাস দিয়েছে, ভারতে অপরাধ করে বর্তমানে পাকিস্তানে অবস্থানকারী অনেক অপরাধীকে ইসলামাবাদ নয়াদিলি্লর কাছে হস্তান্তর করতে পারে না। তবে অতীতে সীমান্ত এলাকায় চার শতাধিক নিরীহ বাংলাদেশিকে হত্যার জন্য বাংলাদেশ ভারতকে ক্ষমা করেনি। ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) অনুপ্রবেশ ঠেকানোর অনেক খবর এসেছে। বন্ধু রাষ্ট্রের নাগরিকদের কি গুলি করে হত্যা করা উচিত? এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে হত্যা নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ভারত যদি বাংলাদেশের নাগরিকদের ওয়ার্ক পারমিট দিত, তাহলে অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমত। তারা কাজ করার জন্য ভারতে আসে এবং দেশে তাদের পরিবার-পরিজনদের কাছে উপার্জিত অর্থ পাঠায়। তারা ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চায় না। ঢাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণের প্রস্তাব যৌক্তিক। যৌথ ইশতেহারে এ সম্ভাবনার কথা উল্লেখ রয়েছে। দিলি্ল, মুম্বাই বা কলকাতায় যানবাহনের চাপ বড্ড বেশি। তবে ঢাকার অবস্থা দুর্বিষহ। সেখানে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। আমি বাংলাদেশের জন্ম এবং এর নিয়মিত প্রবৃদ্ধি দেখেছি। যখন এটি পাকিস্তানের অংশ ছিল তখন বাংলাদেশকে নিয়ে এতটা আশাবাদ ছিল না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার দশক পর আজও অনেকে এ ভূখণ্ড নিয়ে ততটা আশাবাদী নয়। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা এবং তৈরি পোশাকশিল্পের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বাংলাদেশকে ৫ শতাংশেরও বেশি বার্ষিক প্রবৃদ্ধি এনে দিয়েছে। ক্ষুদ্র চাষিরা দেশটির গ্রামাঞ্চলকে প্রায় স্বনির্ভর করেছে। এটাও সত্যি যে বাংলাদেশিরা এখনো নিজেদের সামর্থের ব্যাপারে নিশ্চিত নয়। তাদের অনুধাবন করতে হবে, বাংলাদেশ সীমিত সম্পদের এক ছোট দেশ। তাদের ধৈর্য বেশ আশাব্যঞ্জক। তবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষমতার পুঞ্জীভবন কোনো ভালো লক্ষণ নয়। এতে জবাবদিহিতার বদলে একচ্ছত্র ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়ে। গণতন্ত্র বিকাশের জন্য সবচেয়ে ভালো হতো স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোকে আরো গতিশীল ও কার্যকর করা গেলে। এই অঞ্চলে যদি নানা দল ও মতের অংশগ্রহণে আরো একটি গণতান্ত্রিক দেশের বিকাশ ঘটে, তাতে ভারতের আশ্বস্ত হওয়া উচিত। উদার বিশ্বের দেশ বাংলাদেশ রক্তের নদী পারি দিয়ে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র টিকিয়ে রেখেছে। একটি উদার, গণতান্ত্রিক মুসলিম রাষ্ট্র গোটা মুসলিম বিশ্বকে পথ দেখাতে পারে। শেখ হাসিনার শাসনব্যবস্থায় কর্তৃত্ববাদের ছাপ আছে। ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যেও এ প্রবণতা ছিল এবং ভারতকেও দুই বছরের জরুরি অবস্থার মাশুল গুনতে হয়েছে। বিভিন্ন সময়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ধৈর্যহীন, অত্যন্ত প্রভাবিত এবং অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হিসেবে আবির্ভূত হন। বিরোধীরা নয়, তিনি নিজেই নিজের ভয় পাওয়ার কারণ হতে পারেন। লেখক: নয়াদিলি্লর সিনিয়র সাংবাদিক নিবন্ধটি পাকিস্তানের ডন পত্রিকা থেকে নেওয়া। ভাষান্তর: মেহেদী হাসান

Advertisements

February 6, 2010 - Posted by | Foreign Affairs, National | , , , , , , , , , , ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: