My Blog My World

Collection of Online Publications

পানি: কাশ্মীরের চেয়েও বড় সংকট

নিবন্ধটি ২ মার্চ দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে।
সিদ্ধার্থ বরদারাজন
আবারও আলোচনায় বসেছে ভারত ও পাকিস্তান। নতুন বাস্তবতায় এবার নয়াদিল্লিকে কাশ্মীরের চেয়েও বড় একটি ইস্যু মোকাবিলা করতে হবে। আর তা হলো পানি। পাকিস্তান কোনো রাখঢাক না-রেখেই ভারতের বিরুদ্ধে পানি চুরির অভিযোগ এনেছে। এ অভিযোগ কেবল সরকারের নয়, কাশ্মীরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আন্দোলনরত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোরও।
পানি নিয়ে আন্দোলন কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের দাবি নিয়ে আন্দোলনের চেয়েও বড় হতে পারে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং পানি-ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে পাকিস্তানে মাথাপিছু পানিপ্রাপ্তির পরিমাণ দিন দিন উল্লেখযোগ্য হারে কমছে। ২০২৫ সাল নাগাদ মাথাপিছু পানিপ্রাপ্তির পরিমাণ ৭০০ ঘন মিটারের চেয়েও কম হতে পারে। সিন্ধু পানিচুক্তির কারণে সিন্ধুতে কটরি ব্যারেজ নির্মাণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দিনে দিনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পানিতে লবণাক্ততার হার বেড়েছে, থাট্টা এবং বারিনের মতো উপকূলীয় জেলাগুলোয় কৃষিব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
এদিকে জম্মু ও কাশ্মীরে বাগলিহারের মতো পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে পাকিস্তানে পানিপ্রবাহ কমেছে। লস্কর-ই-তৈয়বা, জামাত-উদ-দাওয়ার মতো প্রতিক্রিয়াশীল সংগঠনগুলো এ জন্য নয়াদিল্লিকে দায়ী করছে। ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের পানি চুরির অভিযোগ কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর ভারতবিরোধী আন্দোলনকে উসকে দেয়নি, পানিসংকটে ভুগছে এমন অন্য প্রদেশগুলোকেও ভারতের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করে তুলছে।
অন্যদিকে ভারত থেকে পাকিস্তানে প্রবাহিত নদীগুলোর পানিপ্রবাহ দিন দিন কমছে। পানিপ্রবাহের মাসভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অর্ধেক পানি প্রবাহিত হয়েছে। ভারতের যুক্তি, বৃষ্টিপাত এবং বরফ-গলা কমার কারণেই এমনটি হয়েছে। তবে পাকিস্তান এ যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, ভারতীয় অংশে পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের কারণেই দেশটির পানিপ্রবাহ কমে গেছে। এ কারণে ২৫ ফেব্র“য়ারি দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকে পাকিস্তানের কাছে পানিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ভারতও এ ইস্যুকে এড়াতে পারছে না।
সন্ত্রাসবাদের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ পানি-ইস্যুকে নিয়ে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতকে দুটি কৌশলগত বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, পানি নিয়ে কোনো আলোচনা না-হলে বা আলোচনায় ইসলামাবাদের প্রত্যাশিত ফল না-এলে পাকিস্তানি রাজনীতিতে কী প্রভাব পড়বে? বিশেষ করে, ভয়াবহ পানিসংকটের শিকার সিন্ধু এবং বেলুচিস্তানে ভারতবিরোধী মনোভাব কতটা তীব্র হবে? দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের প্রত্যাশামতো পানি দিলে ইসলামাবাদ কি ভারতবিরোধী পাকিস্তানি গোষ্ঠীগুলোকে দমন করবে?
অনেকে মনে করেন, পাকিস্তান তার জঙ্গি-সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে দমন করলে ভারত পাকিস্তানকে পর্যাপ্ত পানি দিতে পারে। কিন্তু বিষয়টি এত সহজ হলে প্রতিবেশী দেশ দুটি আলোচনার টেবিলে বসেই সমস্যা সমাধান করবে অথবা যুদ্ধে জড়াবে। সন্ত্রাসবাদ এবং পানির যোগসূত্র আরো জটিল। পাকিস্তানকে বোঝা উচিত, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে ভারত তার বিনিময়ে লিখিত অঙ্গীকারের চেয়েও বেশি কিছু করবে।
পানি নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের বিরোধের ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পর বিরোধ আরো জটিল হয়েছে। মানচিত্রের ওপর দাগ টেনে ব্রিটিশ ভূখণ্ড ভাগ করা র‌্যাডকিফের জন্য বেশ সহজ ছিল। কিন্তু জনগণ ও পানি ভাগ করা বেশ কঠিন। গণ-অভিবাসন এবং রক্তপাতের কথা আমাদের সবার জানা। যে-নদীর পানিতে নতুন অঞ্চলে চাষাবাদ হলো, তার সবগুলোর উৎপত্তি ভারতে। ফলে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই পানি নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়ে উঠেছিল। বিরোধ নিরসনে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ১৯৬০ সালে স্বারিত হয় সিন্ধু পানিচুক্তি।
পাকিস্তান সরকার বিভিন্ন সময় ভারতের বিরুদ্ধে সিন্ধু পানিচুক্তি ভাঙার অভিযোগ তুলেছে। ২০০৫ সালে বাগলিহার প্রকল্প নিয়ে পাকিস্তান আপত্তি তুললে আন্তর্জাতিক সালিসি বোর্ডে কিছু সংশোধনী সাপেক্ষে প্রকল্প অনুমোদন পায়। এর আগে, সত্তরের দশকে দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিব-পর্যায়ের বৈঠকে সালাল প্রকল্প নিয়ে বিরোধ নিরসন হয়েছিল। এখন পাকিস্তান চন্দ্রভাগা এবং ঝিলাম নদীতে ভারতের প্রকল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক সালিসি বোর্ডের কাছে যেতে পারে।
পাকিস্তানে পানিপ্রবাহ কম হওয়ার কারণ কেবল ভারত ও চীনে বৃষ্টিপাত ও বরফ-গলার হার কমে যাওয়া নয়; বরং নদী, খাল-বিলগুলো দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। এ বিষয়টি কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, আঞ্চলিক ও সর্বজনীন সমস্যা। পাকিস্তানকে এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ল্য নিয়েই এগিয়ে যাওয়া উচিত। সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারত-পাকিস্তান আলোচনা ফলপ্রসূ করতে হলে সিন্ধু অববাহিকার উন্নয়ন নিয়ে দুপকে একযোগে কাজ করতে হবে। আবার, এও সত্যি যে, পাকিস্তান যদি তার উগ্র ও জঙ্গি সংগঠনগুলোকে পানি-ইস্যুতে ভারতবিরোধী আন্দোলন ও কর্মকাণ্ড চালাতে দেয়, তাহলে আলোচনার টেবিলে কোনো সমাধান হবে না।
লেখক: সাংবাদিক
নিবন্ধটি ভারতের ‘হিন্দু’ পত্রিকা থেকে নেওয়া। সংপ্তি ভাষান্তর: মেহেদী হাসান

Advertisements

February 25, 2010 - Posted by | Foreign Affairs, Global Warming, International, Peace | , , , , , , , ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: