My Blog My World

Collection of Online Publications

যেখানে নিষিদ্ধ বসন্ত বরণ

ইরফান হোসেইন

৪ মার্চ কালের কণ্ঠে এই নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

পাকিস্তানজুড়ে যখন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আর জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ ভর করেছে তখন আমাদের আদালত এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের বোঝা উচিত, বসন্ত উৎসব উদ্যাপন নিষিদ্ধ করে খুব একটা ফল আসবে না। বসন্ত উদ্যাপনের সময় পাকিস্তানের জনগণ ঘুড়ি ওড়ায়। এ এই ভূখণ্ডের কয়েক শ বছরের পুরনো ঐতিহ্য। ২০০৫ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট বসন্ত বরণ উৎসব নিষিদ্ধ করলেও এ বছর আবার আলোচনায় এসেছে। ওই নিষিদ্ধকরণ আদেশ শিথিল করার জন্য এক আবেদন সম্প্রতি খারিজ হয় লাহোর হাই কোর্টে। বসন্ত বরণ উৎসব নিষিদ্ধ করার পেছনে আদালতের যুক্তি হলো, উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা অর্থাৎ ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে অনেক শিশু আহত হয়। অনেকে ছাদ থেকে পড়ে যায়। উৎসবকে নিরাপদ করতে প্রশাসনকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার পরিবর্তে সুপ্রিম কোর্ট পুরো উৎসবই নিষিদ্ধ করে দিলেন। এদিকে লাহোর জেলার পদস্থ কর্মকর্তা সাজ্জাদ ভুট্টো বসন্ত উৎসব নিষিদ্ধ করার নেপথ্যে আরো ‘মহৎ’ কারণ খুঁজে পেলেন। তাঁর মতে, বসন্ত মদপান আর নাচ-গানের অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়েছিল। তাই বসন্ত উৎসব নিষিদ্ধ করার কোনো বিকল্প ছিল না। সাজ্জাদ ভুট্টোর কথার সঙ্গে কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতাদের বক্তব্যের অনেক মিল আছে। তাঁরা বসন্ত বরণকে বার্ষিক অনাচার উৎসব বা হিন্দু ধর্মীয় উৎসব বলে ফতোয়া দেন। অথচ, ঋতুরাজ বসন্তের আগমনকে স্বাগত জানিয়ে সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের অংশগ্রহণে যে বরণ অনুষ্ঠান হয় তাতে কোনো উগ্রতা বা গোঁড়ামির স্থান নেই। ইরানে বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে ফার্সি নববর্ষ নওরোজ উদ্যাপিত হয়। আয়াতুল্লাহর ফতোয়া নববর্ষ উৎসব আয়োজনে ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। আর, ইরানের ধর্মীয় নেতারাও এতদিনে বুঝতে পেরেছেন ধর্মের নামে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত ঘটানো যায় না। পাকিস্তানের ধর্মীয় নেতাদের ওপর আফগানিস্তানের তালেবানদের প্রভাব রয়েছে। তারা জনগণের বিনোদনের পথগুলোকে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। অসহিষ্ণুতা আর ছলনাই এখন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিনোদনের সুযোগ বন্ধ করতে উগ্রবাদী-জঙ্গিবাদীরা এখন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। যারা বসন্ত বরণকে হিন্দুদের অনুষ্ঠান বলে দাবি করছেন, তাঁরা কি জানে না যে, মধ্য পাকিস্তানে বিয়ের অনুষ্ঠানের রীতিগুলো হিন্দু সমাজ থেকে এসেছে। আর যৌতুকের বিধান তো ইসলামে নেই। পাকিস্তানের বিচারক, আমলা এবং ধর্মীয় নেতাদের বোঝা উচিত, করণীয় আর অকরণীয়র তালিকার বাইরেও আমাদের জীবনে অনেক কিছু আছে। তালেবানরা আফগান জনগণের জন্য করণীয়-অকরণীয় কাজের তালিকা দিয়েছিল। এরপর পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকা যখন অস্থিতিশীল হয়ে উঠল তখন ভিডিওর দোকানগুলো একে একে বন্ধ হয়ে গেল। নিষিদ্ধ হলো গান শোনা। আর, মেয়েদের স্কুলে যাওয়া তখন তো কল্পনাতীত ব্যাপার। যখন আমরা সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার কথা বলি তখন আমাদের অনুধাবন করা উচিত, কয়েকজন সন্ত্রাসী হত্যা করে ল্য অর্জন সম্ভব নয়। আমাদের মনোভাব বদলাতে হবে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক যখন পাকিস্তানে তথাকথিত ইসলামী আইন জারি করেন, তখন থেকেই নানামুখী সংকট আমাদের পিছু নিয়েছে। প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় গোষ্ঠীর কবল থেকে পাকিস্তানকে রা করতে হলে আমাদের সমাজ ও শিাব্যবস্থার আমূল বদলাতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে ধৈর্য, স্থিতিশীলতা, উদারতার শিা দিতে হবে। গণমাধ্যমে উগ্র ধর্মীয় আলোচনা বন্ধ করতে হবে। যখন আমরা বসন্ত বরণ অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করি তখন আমাদের দেশের প্রতিক্রিয়াশীল, জঙ্গি অপশক্তিরাই লাভবান হয়। ঐ অপশক্তিরা এক একটি দাবি অর্জনের পর নতুন নতুন দাবি তোলে। কয়েক বছর আগে ইংরেজি নতুন বছর উদ্যাপন অনুষ্ঠানে জঙ্গি হামলার পর এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন অনেকটাই কমে গেছে। বসন্ত বরণ উৎসবও কি একই ভাগ্য বরণ করতে চলেছে? আমার বন্ধু পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসির যখন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বসন্ত বরণ উৎসব পালনের কথা ঘোষণা করেন, তখন আমি খুব খুশি হয়েছি। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে গভর্নরকে হাতকড়া পরিয়ে গভর্নর হাউস থেকে বিতাড়িত করার হুমকি দেন পিএমএল-এনের এক সিনেটর। এ ধরনের হুমকি পাকিস্তানের যেকোনো স্তরেই এখন খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। আমরা আমাদের আইন, সংবিধান ব্যবহার করে বিনোদনের পথগুলো এক এক করে বন্ধ করছি। ১৯৭৭ সালে ভুট্টো এ ধরনের নিষিদ্ধকরণ শুরু করেছিলেন। এটা যে ভুল ছিল, তা তিনি স্বীকার করেছিলেন জীবনের শেষবেলায় কনডেম সেলে বসে। তবে পরবর্তী শাসক জিয়া ধর্মীয় অনুশাসন আরো পাকাপোক্ত করেন। অথচ যুগে যুগে মুসলিম শাসকরা শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মীদের বিশেষ সম্মান দিয়েছেন। তবে পাকিস্তানের ধর্মীয় নেতারা এবং সামরিক বাহিনী মনে করে, মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে পাকিস্তান আলাদা। লেখক: পাকিস্তানি সাংবাদিক নিবন্ধটি পাকিস্তানের ডন পত্রিকা থেকে নেওয়া। সংপ্তি ভাষান্তর: মেহেদী হাসান

Advertisements

March 3, 2010 - Posted by | International | , ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: