My Blog My World

Collection of Online Publications

নারীর সংগ্রাম বিশ্বময়

নিকোলাস ডি ক্রিস্টফ ও শেরিল উডান

উনিশ শতকের নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় লড়াই ছিল দাসত্বের বিরুদ্ধে। বিশ শতকে এসে তা দাঁড়িয়েছে সব ক্ষেত্রে অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে। এ শতকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নারীর প্রতি সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। এখনো পাচার, হত্যা, যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে বিশ্বের নারীরা। সীমাহীন বৈষম্য আর নিপীড়নের মধ্যে দরিদ্র দেশগুলোর নারীদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের খড়গ বেশি। এটাও সত্যি, পরিবর্তিত অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রোপটে আজ নারীর অবস্থান অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো; কিন্তু এরপরও অপ্রাপ্তির বিষয়টি সহজে মানা যায় না। একজন চীনা নাগরিকের কথা মনে পড়ছে। তিনি বলেছিলেন, আকাশের অর্ধেক মালিক পুরুষ আর অর্ধেক নারী। নারীর সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দিতে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে-পড়া দেশগুলোতে বিশ্বব্যাংক থেকে শুরু করে বহুজাতিক বেসরকারি সংস্থার কার্যক্রম জোরদার হচ্ছে। বিশ্ব এক বিশাল সত্যকে বুঝতে শিখছে। আর তা হলো নারী ও কন্যাশিশু কোনো সমস্যা নয়। তারা সমাধান।
লাহোর শহরের এক বস্তির সামনে সায়মা মোহাম্মদ নামে এক নারীকে কাঁদতে দেখেছিলাম। দরিদ্র স্বামীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করার পরও পুত্রসন্তান জন্ম না দিতে পারার ব্যর্থতায় সংসার ভাঙতে যাচ্ছিল তাঁর। ক্ষুদ্র ঋণপ্রদানকারী একটি প্রতিষ্ঠান তাঁর পাশে দাঁড়ানোর পর তিনি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠেন। যে স্বামীর অনুমতি ছাড়া তাঁর বাড়ির বাইরে যাওয়া বারণ ছিল, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী স্ত্রীর বাড়ির বাইরে যাওয়া মেনে নিলেন সেই স্বামীই। সায়মার মতো এমন অনেক উদাহরণ আছে আমাদের সামনে। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিনিধি হিসেবে বেইজিংয়ে অবস্থানকালে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে বিক্ষোভে ও সহিংসতা দেখেছি। সেদিনের আন্দোলনকারী নারীদের খবর ছাপার জন্য চীনের পত্রিকায় এক ইঞ্চি জায়গাও হয়নি। বিপুলসংখ্যক নারী ও কন্যাশিশুকে অপহরণ এবং যৌনপল্লীতে পাচার করার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হলেও গণমাধ্যমে এর গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ১৯৮০ সালে তাঁর এক নিবন্ধে বলেছিলেন, বিশ্বে ১০০ মিলিয়নেরও বেশি নারী নিখোঁজ রয়েছে। সেন আরো বলেন, সাধারণত নারীরা পুরুষের চেয়ে বেশি দিন বাঁচে। এরপরও চীন, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যখন নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে কম হয়, তখন নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ আরো জোরালো হয়। কেবল পাচার, হত্যার কারণেই নারীর সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে- এমনটি নয়। পুত্রশিশুর তুলনায় কম খাবার পেয়ে অপুষ্টির শিকার হয়ে ঝরে পড়ে কন্যাশিশুরা। টিকাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও ভারতে বৈষম্যের শিকার কন্যাশিশুরা। এ কারণে কন্যাশিশুদের বেশি রোগব্যাধি মোকাবিলা করতে হয়। আল্ট্রাসাউন্ড মেশিনের সাহায্যে ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই যেমন শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণ করার সুযোগ বেড়েছে, তেমনি এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কন্যাশিশুর ভ্রুণহত্যা ।
লিঙ্গভিত্তিক নির্যাতনের হিসাবে নারীর প্রতি নির্যাতন-সহিংসতার হার বিশ্বব্যাপী বেড়েই চলেছে। বর্তমান শতাব্দীতে নতুন নতুন যুদ্ধ-অভিযান নারী নির্যাতনের নতুন উপল হয়ে উঠছে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাব অনুযায়ী, ১২ দশমিক ৩ মিলিয়ন মানুষকে জোরপূর্বক যৌনপল্লীসহ বিভিন্ন স্থানে কাজ করতে হচ্ছে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে এ ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যাই বেশি। তারা তাদের প্রাপ্য মজুরিটুকুও পায় না। উপরন্তু তাদের শরীরে বাসা বাঁধে এইডসের মতো ভয়াবহ ব্যাধি।
সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে এখনো মারা যাচ্ছে বিপুলসংখ্যক নারী। অপুষ্টি, অযত্ন, অনাদর, অবহেলা আর প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা না পাওয়াই এর কারণ।
ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলো কেন নারীদের ল্য করেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে?-এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে ক্ষুদ্রঋণেরসুফল ভোগকারীদের দেখলে। তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছে। প্রতিবাদ, প্রতিরোধের মাধ্যমে অধিকার আদায় করতে শিখেছে। বিল গেট্স তাঁর সৌদি সফর এবং একটি অনুষ্ঠানের স্মৃতিচারণা করে বলেছেন, দর্শকদের পাঁচ ভাগের চার ভাগই ছিল পুরুষ। নারীরা ছিল এক কোণায়। তাঁকে প্রশ্ন করা হলো সৌদি আরব কবে নাগাদ প্রযুক্তিতে শীর্ষ ১০ দেশে নাম লেখাতে পারবে? তিনি উত্তর দেন, যে পর্যন্ত নারী-পুরুষ সবার মেধা ও যোগ্যতা কাজে লাগানো যাবে না সে পর্যন্ত সৌদি আরব ওই তালিকার কাছাকাছিও পৌঁছতে পারবে না।
নীতিনির্ধারকরাও এখন ইতিবাচক বার্তা পাচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট ওবামা তাঁর প্রশাসনে নারীদের নিয়োগ করেছেন। বিভিন্ন দেশে মতার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে নারীরা। নির্যাতন, নিপীড়ন, চোখ রাঙানিসহ সব বাধা মোকাবিলা করে বিশ্বের সব প্রান্তের নারীরা নিশ্চয়ই একদিন আকাশের ভাগ দাবি করতে পারবে। বিশ্বব্যাপী আজ ছড়িয়ে পড়েছে তাদের সংগ্রাম।
লেখকদ্বয় নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক। নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া নিবন্ধটির সংপ্তি ভাষান্তর: মেহেদী হাসান

Advertisements

March 7, 2010 - Posted by | Gender, Uncategorized |

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: