My Blog My World

Collection of Online Publications

রক্তবন্যায় ‘গণতন্ত্র’ উপহার

রবার্ট ফিস্ক

(নিবন্ধটি ১১ মার্চ কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে)

রক্তবন্যা ও সহিংসতার আগুন পাড়ি দিয়ে পশ্চিমা বিশ্বকে ‘গণতন্ত্র’ উপহার দিল আরো একটি রাষ্ট্র। কিন্তু অতীতে বারবার প্রমাণ হয়েছে, পশ্চিমা সেনারা দেশ দখল করে রাখলে সেখানে গণতন্ত্র কার্যকর হয় না। পশ্চিমাদের প্রত্যাশা পূরণ করে গণতন্ত্রের পথে পাড়ি জমানো এবারের দেশটির নাম ইরাক। ২০০৫ সালে দেশটির এই যাত্রা শুরু হয়েছিল আত্নঘাতী বোমা হামলাকারীদের ব্যাপক হামলার মধ্য দিয়ে। ভোটে অংশগ্রহণ, না বর্জন_এমন দ্বন্দ্ব এবং বোমা হামলার আশঙ্কার মধ্যে লক্ষাধিক ভোটার সে বছর ভোটের দিনে ভোটকেন্দ্রে ছুটেছিলেন। ভোট দেওয়ার মাধ্যমে তাঁরা সেদিন ‘গণতান্ত্রিক ইরাক’ প্রতিষ্ঠার প্রমাণ দিতে চেয়েছিলেন। আধুনিক ইরাকের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ রক্তপাতের সাক্ষী হয়েছিলেন তাঁরা। পাঁচ বছর পর এ সপ্তাহে ইরাকে ‘গণতন্ত্র’ প্রমাণের জন্য নির্বাচনের দিন মর্টার হামলার মধ্যে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গেছেন। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার আগে বিভিন্ন সহিংসতায় কমপক্ষে ২৪ জন নিহত হয়েছেন। এবার সুন্নিরা ভোট দিয়েছেন। আমরা পশ্চিমারা অতীত এমনকি নিকট-অতীত ভোলার চেষ্টা করেছি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিবেদনে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, বাথ পার্টির সঙ্গে যোগসূত্র থাকার অভিযোগ নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে কয়েক শ প্রার্থীর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ওই প্রার্থীদের বেশির ভাগই সুনি্ন। এটি সুস্পষ্টভাবেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রত্যাবর্তন। যে ‘গণতান্ত্রিক’ ইরাক গড়ার লক্ষ্যে ভোটাররা এ সপ্তাহে ভোট দিয়েছেন, সেই ইরাক সরকারেরই অনেক পদে আছে শিয়ারা। সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে শিয়াদের সুসম্পর্ক ছিল। ইরাকের নতুন আইন অনুযায়ী এমন নির্বাচন-ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে, যেখানে কোনো দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। পার্লামেন্টে সদস্যপদ পাওয়ার জন্য ৮৬টি দলের ছয় হাজারেরও বেশি প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। টেলিভিশন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, দলগুলোর মধ্যে ক্ষুদ্র বা বৃহৎ জোট গঠিত হতে পারে। এসবের অর্থ হলো ইরাকের পরবর্তী সাম্প্রদায়িক সরকারে আনুপাতিক হারে শিয়া, সুনি্ন এবং কুর্দি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। পশ্চিমারা বরাবরই মধ্যপ্রাচ্যের শাসনব্যবস্থাকে শ্রেয় মনে করেছে। তারা জানে, এই ধারার ‘গণতন্ত্রে’ সব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বে সরকার গঠন করা হয়। এমন এক সরকারব্যবস্থা আমরা উত্তর আয়ারল্যান্ডে প্রতিষ্ঠা করেছি। প্রতিষ্ঠা করেছি সাইপ্রাসেও। ফরাসিরা এমন এক লেবানন প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে সরকারব্যবস্থায় সব সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। এমনকি আফগানিস্তানেও আমরা এমনটা করেছি। দুর্নীতিবাজ হামিদ কারজাইয়ের সঙ্গে আমরা আপস করাকেই শ্রেয় মনে করেছি। বেতনভুক্ত উপজাতীয় সদস্যদের প্রাধান্য দিয়ে আফগান সেনবাহিনী গঠন করা হয়েছে। কারজাইকে আমাদের পক্ষে সেই বাহিনী নিয়ে দেশ পরিচালনার অনুমতি আমরা দিয়েছি। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্ভাব্য হাস্যকর অজুহাত ‘জেফারসনীয় গণতন্ত্র’র কারণে এটা না-ও হতে পারে। আমাদের যেসব কাজ ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে, তার পক্ষে আমরা সব সময় সাফাই গাই। আমরা পাল্টা প্রশ্ন করি, কেউ কি চায় তালেবান বা সাদ্দাম হোসেন বা অটোমান তুর্কিরা ফিরে আসুক? আর যখন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ওই দেশগুলোর নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করি, তখন কে জয়ী হয়েছে তা বুঝতে পারি না। ইরানের প্রবল ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট গণতান্ত্রিক নির্বাচনেও ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারেন। নিঃসন্দেহে তিনি বিজয়ী। ইরানের বাহিনীর একটি গুলিও খরচ হয়নি, অথচ তাদের দুই শত্রু তালেবান ও সাদ্দাম উৎখাত হয়েছে। সুনি্ন রাজনীতিবিদরা অভিযোগ করতে পারেন, ইরান রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে ইরাকে হস্তক্ষেপ করছে। তবে ইরাকে বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে যেহেতু ইসলামিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন, সেহেতু এখানে ইরানের হস্তক্ষেপের কোনো প্রয়োজন নেই। যে দাওয়া পার্টির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এখন আমরা শ্রদ্ধায় মাথা নত করি, সেই দলই ২০ বছর আগে কুয়েত সিটিতে ফরাসি এবং মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলা চালিয়েছে এবং বৈরুতে বিদেশিদের অপহরণ করেছে। আর আমরা মসুল এবং ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলোর কথা উল্লেখই করি না। তেলসমৃদ্ধ ওই শহরগুলোতে নির্বাচন কেবল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয়, আরব ও কুর্দিদের মধ্যে তেলক্ষেত্রে অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। হ্যাঁ, ইরাকি জনগণ সাহসী। মর্টার হামলার মধ্যে কতজন ব্রিটিশ নাগরিক ভোট দিতে যাবেন? আমেরিকানরাই বা কী করবেন এমন পরিস্থিতিতে? ইরাকিরা এমন মুসলমান নন, যাঁরা স্বাধীনতা বা গণতন্ত্র চান না। বরং এটাই সত্য যে পশ্চিমা বাহিনী যত দিন তাদের দখল করা ভূখণ্ডে অবস্থান করবে তত দিন ‘গণতন্ত্র’ কার্যকর হতে দেখা যাবে না। আফগানিস্তানে গণতন্ত্র কার্যকর হয়নি। ইরাক থেকে মার্কিন ‘পোশাকধারী’ সৈন্য প্রত্যাহারের অর্থ এই নয় যে ইরাকে মার্কিন বাহিনীর শক্তি কমে যাবে। আর যত দিন মুবারক এবং বাদশাহ আবদুল্লাহর প্রতি আমাদের সমালোচনাহীন রাজনৈতিক সমর্থন থাকবে, তত দিন তাঁদের দেশগুলো স্বাধীনতার পথে এগিয়ে কোনো অগ্রগতি অর্জন করবে না। ইরাকে এ সপ্তাহে নির্বাচন পশ্চিমা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রমাণ দেয় না। নিবন্ধটি নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া, ভাষান্তর: মেহেদী হাসান

Advertisements

March 11, 2010 - Posted by | International, Media | , , ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: