My Blog My World

Collection of Online Publications

আইনসভায় নারী-আসনই যথেষ্ট নয়

সুহাসিনী হায়দার

(নিবন্ধটি ১৪ মার্চ কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে)

আইনসভায় নারীর জন্য আসন সংরক্ষণের উদ্দেশ্য হলো আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনসভায় নারীর জন্য আসন সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি। সামগ্রিক অবস্থা পরিবর্তনের জন্য নারীর ক্ষমতায়ন প্রয়োজন। সম্প্রতি ভারতের আইনসভায় নারীর জন্য আসন সংরক্ষণ নিয়ে বিতর্ক চলাকালে পার্লামেন্টের ভেতর ও বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারীর জন্য আসন সংরক্ষণের সাফল্য তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, ৪০টি দেশে নারীর জন্য আসন সংরক্ষণের উদাহরণ ভারত অনুকরণ করতে পারে। ভারতের আইনসভায় নারীর জন্য আসন সংরক্ষণের বিলটি আইনে রূপান্তরিত হলে ২০১৪ সাল নাগাদ ভারতের লোকসভায় নারীর সংখ্যা বর্তমানের (৫৯) চেয়ে তিন গুণেরও বেশি (১৮১) বাড়বে। আইনসভায় নারীর উপস্থিতির বৈশ্বিক তালিকায় ভারত ৯৯তম থেকে ১৮তম স্থানে পেঁৗছাবে। এর ফলে ভারতের কতটুকু অগ্রগতি অর্জিত হবে, সে ব্যাপারে ধারণা পাওয়ার আগে সাফল্যের উদাহরণগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
আইন প্রণয়ন কাজে ব্যাপক হারে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে রুয়ান্ডায় কোনো বিতর্ক দেখা যায়নি। বিশ্বের অন্যতম দরিদ্রতম এই দেশে ১৯৯৪ সালে ভয়াবহ গণহত্যায় প্রায় আট লাখ মানুষ নিহত হয়। ২০০৩ সালে গণহত্যা-পরবর্তী সংবিধান অনুযায়ী আইনসভায় নারীর জন্য ৩০ শতাংশ আসন সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সব রেকর্ড ভেঙে রুয়ান্ডার আইনসভার নিম্নকক্ষ চেম্বার ডি ডেপুটিজে নারীরা ৫৬ দশমিক ৩ শতাংশ আসন লাভ করে। এর মাধ্যমে রুয়ান্ডা বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়, যেখানে নির্বাচিত পুরুষ সদস্যের চেয়ে নারী সদস্যের সংখ্যা বেশি।
রুয়ান্ডার নারীদের এই অগ্রযাত্রার পেছনে কতগুলো বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই। গণহত্যা-পরবর্তী রুয়ান্ডার মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশই নারী। দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার অনেক দেশের তুলনায় এ হার বেশি। দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলোর তুলনায় এই চিত্র ভিন্ন। রুয়ান্ডার আইনসভার নারী সদস্যরা নারী ইস্যুতে তেমন কোনো উদ্যোগই নেননি।
উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তানের কথাও বলা যেতে পারে। বেনজির ভুট্টো প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বিতর্কিত হুদুদ অধ্যাদেশ বাতিল করতে পারেননি। এ অধ্যাদেশে ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীর অভিযোগ আমলে নেওয়ার জন্য কমপক্ষে চারজন পুরুষ সাক্ষী হাজির করা এবং তাতে ব্যর্থ হলে ব্যভিচারের অভিযোগে ধর্ষিতার ওপর পাথর নিক্ষেপের কথা বলা হয়েছে।
২০০০ সালে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি নারীদের জন্য সাড়ে ১৭ শতাংশ আসন সংরক্ষণ করলেও ২০০৯ সালে সোয়াত উপত্যকায় শরিয়া আইন জারি করে নারীদের বাড়ির বাইরে পড়ালেখা এবং চাকরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে কোটা ব্যবস্থায় নারীর জন্য নির্বাচন নয় বরং মনোনয়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আইনসভায় যে দলের সদস্য যত বেশি, তারা তত বেশি নারী সদস্য মনোনয়নের সুযোগ পায়। আর এসব মনোনীত সদস্যরা সাধারণত প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য। ভারতে এ ধরনের বিধান করা হলে হয়তো প্রভাবশালী রাজনীতিক এবং শিল্পপতির স্ত্রী-কন্যারাই এ সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া কেবল নারীদের জন্য পৃথক আসন বরাদ্দ দেওয়া হলে নারী প্রার্থীদের সঙ্গেই নারী প্রার্থীদের প্রতিযোগিতা হবে।
উপমহাদেশে কেবল বেনজির ভুট্টোই নয়, উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নারীকে নির্বাচিত করার আগে এই অঞ্চলে আরো চারজন নারী রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছেন। তাঁরা হলেন ভারতের ইন্দিরা গান্ধী, শ্রীলঙ্কার শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে এবং তাঁর কন্যা চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা, বাংলাদেশের শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া। তাঁরা নিজেদের ব্যতিক্রম হিসেবেই প্রমাণ করেছেন। প্রভাবশালী পিতা বা স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁরা ক্ষমতায় এসেছেন। তাঁরা দেশ পরিচালনা করলেও বিদ্যালয়ে কন্যাশিশুর উপস্থিতি বৃদ্ধি, পুষ্টিহীনতা দূর করা এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা পালন করতে পারছেন বলে মনে হচ্ছে না।
আফগানিস্তানের আইনসভার ২৫২ আসনের মধ্যে ৭৭টি আসন নারীর জন্য সংরক্ষিত থাকলেও দেশটিতে নারীদের জীবনযাত্রার মান প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়। মাতৃমৃত্যু এবং শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার হার এ অঞ্চলের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় কম। দেশটিতে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলেছে। সংরক্ষিত আসনের কয়েকটি শূন্য থাকলেও তার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আগ্রহী নারীদের প্রতি তালেবানের হুমকি অব্যাহত রয়েছে।
পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর সমস্যা প্রায় অভিন্ন। অনেকে নারীর জন্য আইনসভায় আসন সংরক্ষণের কথা বললেও আমি একে যথেষ্ট মনে করি না। বিশ্বের অনেক দেশ এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দল থেকে ৩৩ শতাংশ নারীকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার লেবার পার্টি ইতিমধ্যে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে।
ইউএনডিপির এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের লিঙ্গ সমতাভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীর জন্য আসন সংরক্ষণ নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির ‘দ্রুত’ সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো উদ্যোগ নয়। ভারতের আইনসভায় নারীর জন্য আসন সংরক্ষণ বিল উত্থাপনকারীদের অবশ্যই বলতে হবে, গত ছয় দশকে কেন অধিকসংখ্যক নারীকে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।
সামগ্রিক প্রেক্ষাপট না বদলালে নারীর জন্য কেবল আসন সংরক্ষণ প্রতীকী ব্যাপার হয়েই থাকবে। সত্যিকার অর্থে পরিবর্তন আসলে নারী শুধু অর্ধেক আকাশের মালিকানাই নয়, নিজের ভাগ্যনিয়ন্ত্রণের অধিকারও পাবে।
লেখক : সাংবাদিক
নিবন্ধটি ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকা থেকে নেওয়া। সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর : মেহেদী হাসান

Advertisements

March 14, 2010 - Posted by | Gender | , , , ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: