My Blog My World

Collection of Online Publications

বিশেষ প্রতিবেদন: বিভীষিকার জগতে পাকিস্তানের ‘হারিয়ে যাওয়া’ লোকজন

(নিবন্ধটি ১৯ মার্চ কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে)
রবার্ট ফিস্ক
রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান তার জনগণের সঙ্গে কী নিষ্ঠুর আচরণ করছে, তা যদি কেউ বুঝতে চায়, তাহলে আমিনা জানজুয়ার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ করা উচিত। তিনি একজন বুদ্ধিমতী চিত্রশিল্পী ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনার। রাওয়ালপিন্ডিতে নিজের বাসার লিভিং রুমে বিশাল সোফায় তিনি বসা। ঘরটি যেন তাঁর একাকিত্বকে আরো বাড়িয়ে দেয়। তিনি ও তাঁর পরিবার পাকিস্তানের নিষ্ঠুর নিপীড়নের শিকার। পাঁচ বছর আগে তাঁর স্বামী মাসুদ জানজুয়া ‘হারিয়ে যান’। এটি রাষ্ট্রের জন্য অসম্মানের ও লজ্জার ব্যাপার এবং নিঃসন্দেহে তা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। মাসুদ জানজুয়া কোথায়-এ প্রশ্ন তিনি একে একে সবাইকে করেছেন; এমনকি খোদ প্রেসিডেন্টকেও। তিনি এক অন্ধকার জগতে চলে গেছেন, যেখানে পাকিস্তানের ‘হারিয়ে যাওয়া’ প্রায় আট হাজার মানুষের বাস। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে মার্কিন প্রশাসন ও গোয়েন্দাদের নির্দেশে পুলিশ ও সেনারা ওইসব ব্যক্তিকে তাঁদের বাড়ি বা রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গেছে। আজও তাঁরা ফেরেননি। পাঞ্জাবের যাঁরা হারিয়ে যান, তাঁদের জন্য শুধু লাহোরেই ১২০টি নির্যাতনকেন্দ্র (টর্চার হাউস) আছে। ওইসব ভবনের মাটির নিচের কক্ষে হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের ওপর এমনই নির্যাতন চলে যে তাঁদের আর্তচিৎকার ওইসব ভবনের বাসিন্দারাও শুনতে পায়।
২০০৫ সালের ৩০ জুলাই হারিয়ে যান মাসুদ জানজুয়া। সে সময় তাঁর বয়স ছিল ৪৪ বছর। তিনি তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক একটি কলেজ ও একটি ট্রাভেল এজেন্সি চালাতেন। জানজুয়ার দুই ছেলে মোহাম্মদ ও আলী এবং একমাত্র মেয়ে আলিসা। আর কখনো বাড়ি ফেরেননি তিনি। কেউ জানেন না তাঁর ভাগ্যে কী ঘটেছে। নিজের স্বামীর কথা যখন বলছিলেন ৪০ বছর বয়সী আমিনা, তখন তিনি খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছিলেন।
আমিনা বলেন, ‘আমি মনে করি, জানজুয়ার সঙ্গে যা করা হয়েছে, তা খুব বড় ভুল। আর যখন তারা এ ধরনের ঘটনা ঘটায়, তারা কখনোই তাদের ভুল স্বীকার করে না।’
আমিনা আরো বলেন, এই ‘তারা’ কারা, সে সম্পর্কেই আমি এখানে কথা বলতে চাই। এদের সম্পর্কে অনেকেই এই ভয়ে মুখ খুলতে চায় না যে তাতে হয়তো ‘তারা’ খেপে গিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মেরেই ফেলবে। হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা টর্চার সেলে নির্যাতন সহ্য করে বেঁচে থেকে ছাড়া পেয়েছেন তাঁদের মতে, ‘তারা’ হলো ইন্টার সার্ভিস ইন্টিলিজেন্স (আইএসআই), সামরিক গোয়েন্দা, আমেরিকান। আমিনা তাঁর পরিবারের মতো ২৫টি পরিবার নিয়ে গড়ে তুলেছেন ডিফেন্স অব হিউম্যান রাইটস পাকিস্তান (ডিএইচআরপি)। তাঁরা প্রমাণ পেয়েছেন, ইংরেজি ভাষাভাষী ব্যক্তিরা নির্যাতনের সময় জিজ্ঞাসাবাদ করে। আমিনা পাকিস্তানের সামরিক এলাকা রাওয়ালপিন্ডিতে বাস করেন। তাঁর বাড়ির কাছে পুরনো ব্রিটিশ ব্যারাকে মার্কিন সেনারা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর পোশাক পরে।
আরো বিস্ময়কর হলো, স্বামীর অবস্থান সম্পর্কে তাঁর প্রথম তথ্য পাওয়ার বিষয়টি স্বামী হারিয়ে যাওয়ার পর তাঁর অবস্থান সম্পর্কে জানতে তিনি যখন সুপ্রিম কোর্টে যান, তখন প্রত্যক্ষদর্শীরা তাঁকে জানান, মাসুদ জানজুয়া তাঁর বাড়ির খুব কাছেই অবস্থান করছেন। স্বামী হারিয়ে যাওয়ার পাঁচ মাস পর প্রত্যক্ষদর্শী একজনের সঙ্গে কথা বলতে আমিনা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে যান। সেখানে তিনি জানতে পারেন, তাঁর স্বামী রাওয়ালপিন্ডিতে সেনাবাহিনীর একটি ভবনের নির্জন সেলে বন্দি অবস্থায় আছেন। পাকিস্তানের হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের যে ব্যারাক, ইন্টারোগেশন সেল ও ভূগর্ভস্থ নির্যাতন সেলে স্থানান্তর করা হয়, তার প্রমাণ রয়েছে। ভয়ঙ্কর কিছু কথাও শোনা যায়। এমনও বলা হয়, বন্দিদের আকাশে হেলিকপ্টার থেকে এমন এক স্থানে ছুড়ে ফেলা হয়েছে, যেখানে তেমন জনবসতি নেই। হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তির মৃতদেহ উদ্ধার হতে এত বিলম্ব হবে যে তাতে নির্যাতনের কোনো চিহ্ন থাকবে না। তবে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগ এখনো জীবিত বলে মনে করেন আমিনা।
আমিনা বলেন, ৯/১১-এর পর সবাই উদ্বিগ্ন ছিলেন। নিউইয়র্কে হামলার পর পাকিস্তানে হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ছিল। কেউই জানতেন না, তাঁদের প্রিয়জনকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রথম কয়েক মাস তাঁর জন্য কষ্টকর ছিল। এরপর তিনি এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।
আমিনাই এমন এক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যেটি আজও আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে হারিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে। এ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট এবং লাহোর হাইকোর্ট প্রায় ২০০ জনকে রক্ষা করতে সক্ষম হন নিরাপত্তা বাহিনীর হাত থেকে।
আফগানিস্তানের বাগরাম থেকে অনেকের দেশে ফেরা মার্কিনিদের দয়ার ওপর নির্ভর করছে বলে জানা যায়। সেখানে বন্দিদের নির্যাতন করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করা হয়।
মাসুদ জানজুয়াকে ফিরে পেতে আমিনা আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সঙ্গে আমিনার শ্বশুরের সুসম্পর্কের সুবাদে তাঁর পরিবার জানজুয়াকে উদ্ধারে তৎকালীন প্রেসিডেন্টের সহায়তাও কামনা করেছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্টের অফিসও কার্যত কোনো তথ্য দিতে না পেরে তাঁদের এড়িয়ে চলতে শুরু করে।
আমিনা বলেন, হারিয়ে যাওয়া অনেক ব্যক্তির পরিবারকে বিভিন্ন সময় মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তাদের বলা হয়েছে, তাদের প্রিয়জন ফিরে আসছেন। দেখা গেল, দরিদ্র পরিবারটি খুশিতে মিষ্টি বিতরণ করল এবং দামি পশু জবাই করে সবাইকে খাওয়াল। কিন্তু এরপর যখন দেখা গেল, তাদের প্রিয়জন ফিরছেন না, তখন তাদের মনের অবস্থা কী হতে পারে, ভাবতে পারেন?
হারানো স্বামীকে ফিরে পেতে আইনবিষয়ক শিক্ষাগ্রহণ শেষ করে আইন পেশায় নামেন আমিনা। একসময় তিনি বুঝতে পারেন, এটি নিছক হারিয়ে যাওয়া নয়; এটি সুস্পষ্ট অপহরণ। হারিয়ে যাওয়া ৭৮৮ ব্যক্তির পরিবারের তালিকা নিয়ে এখন গবেষণা করছেন তিনি। আমিনা জানতে পেরেছেন, হারিয়ে যাওয়া অনেককে বাগরামে আবার তিন-চারজনকে গুয়ান্তানামো বে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হারিয়ে যাওয়া সবাই যে জীবিত আছেন, তা-ও নয়।
আদালতের নির্দেশে মুক্তি পাওয়া সবাই নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। নির্যাতন করতে করতে তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, ‘অস্ত্রশস্ত্র কোথায় আছে? মোল্লা ওমর কোথায়?’ এসব বিষয় ইংরেজি ভাষায় জিজ্ঞাসা করা হলেও তাঁরা আমেরিকান কি না সে ব্যাপারে নিশ্চিত নন বন্দিরা।
আমিনার সংগঠন হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের শহরে শহরে বিক্ষোভ করে তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এক বেলুচিস্তান থেকেই হারিয়ে গেছেন এক হাজার ৭০০ জন। পুরো পাকিস্তান থেকে হারিয়ে যাওয়া অন্তত ৭৫০ জনকে আমেরিকানরা অবৈধভাবে তুলে নিয়ে গেছে বলে মনে করা হয়। নিঃসন্দেহে তাঁদের ঠিকানা এখন বাগরাম, কাবুলের বাইরে পলিচর্কি কিংবা পশ্চিম আফগানিস্তানের হেরাত কারাগার।
সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর : মেহেদী হাসান

Advertisements

March 19, 2010 - Posted by | International | ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: