My Blog My World

Collection of Online Publications

পাকিস্তানের পরিস্থিতি যতই খারাপ হচ্ছে সাফল্যের আশা ততই বাড়ছে!

প্রতিশোধমূলক হামলার মূল্য দিয়েছেন বেসামরিক জনগণ
রবার্ট ফিস্ক
কয়েকদিন আগে আমি লাহোর শহরে গাড়ি চালাচ্ছিলাম। এই শহরের জনগণ এখনও সাম্প্রতিক এক আত্নঘাতী হামলার কথা মনে করলেই শিহরে ওঠেন। সেনাবাহিনীর দুটো ট্রাকের পাশে নিজেদের উড়িয়ে দিয়েছিলেন আত্নঘাতী বোমারুরা। এতে ৪৮ জন বেসামরিক নাগরিক এবং ১৮ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হন। সেনাসদস্যদের ল্য করে হামলা চালানো হলেও তার শিকার হচ্ছেন বেসামরিক জনগণ। সন্ত্রাসীদের নির্মূলে আমরা নির্বিচারে হত্যার যে কৌশল নিয়েছি পাকিস্তানের হামলাকারীরাও সেই কৌশল নিয়েছেন। আমেরিকার ‘সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ’র পে অবস্থান নিয়ে পাকিস্তান তার সোয়াত এবং দণি ওয়াজিরিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ করছে তারও মূল্য দিচ্ছেন বেসামরিক নাগরিকরা। বস্তুত এই সংঘাত তালেবান এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে। লাহোরে আমি ল্য না করে পারিনি, যে স্থানটিতে বোমাগুলো বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে সে স্থানটি আরএ ব্যারাক এলাকায়। এখানে হামলার কারণ বুঝতে আমার সময় লেগেছে। তবে সব আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে যখন জেনেছি আরএ ব্রিটেনের রয়্যাল আর্টিলারির সংপ্তি রুপ। হ্যাঁ, আমাদের সাম্রাজ্যবাদী ভূতরা এখনও এখানে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। অন্যদিকে আমেরিকার সর্বসাম্প্রতিক শাসকরা এখানে জনগণের জন্য প্রাচীন রাজাদের আমলের মতো দুর্দশা ভোগ নিশ্চিত করছেন। এখানে কি কখনোই স্বাধীনতা আসবেনা?
লাহোরে আত্নঘাতী হামলার মাত্র তিনদিন পর সিএনএনে রিচার্ড হলব্র“ক নিশ্চিত হয়ে যে কথা বলেছেন তা অত্যন্ত নির্লজ্জতা ও নিষ্ঠুরতার বহি:প্রকাশ। তিনি বলেছেন, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে। তিনি আরো বলেছিলেন, ‘শীর্ষ নেতাদের হারিয়ে আল-কায়েদা চাপে আছে’। আলকায়েদার ১২ জন নেতার মধ্যে ১০ জনকে গত বছর ‘নির্মূল’ করা হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই নিহত হয়েছেন পাকিস্তানি ভূখন্ডে চালকবিহীন বিমান হামলায়। আমার বলা উচিত, মার্কিন হামলায় কেবল ২০০৯ সালেই ৬৬৭ জন নিহত হয়েছেন। এর প্রতিশোধ হিসেবে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে ল্য করে যেসব হামলা চালানো হয়েছে সেগুলোর শিকার হয়েছেন পাকিস্তানের বেসামরিক নাগরিকরাই। এ বছরের প্রথম ৭০ দিনে ১৫ টি আতানঘাতী বোমা হামলায় ৩২২ জন পাকিস্তানি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন ৫০০ জনেরও বেশি। বর্তমানে সোয়াত উপত্যকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুটি ডিভিশন আছে। আরো কয়েকটি বেশি আছে দণি ওয়াজিরিস্তিানে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ডিভিশনগুলো এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে স্থানান্তরের বিষয়টি তার কমান্ডারের এখতিয়ারে বলে স্বীকার করেও মি. হলব্র“ক চেয়েছিলেন, সোয়াত এবং দণি ওয়াজিরিস্তানের ডিভিশনগুলোকে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে স্থানান্তর করা হোক।
ইরাকের কুত-আল-আমারায় লোকমুখে বুশ এবং ব্লেয়ারকে নিয়ে যে গল্প শোনা যায় এখানেও সেই পুরনো গল্প। বাস্তব পরিস্থিতি যত খারাপ হয়, তারা এর উল্টো বলেন। ২০০১ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত আত্নঘাতী হামলা, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অপারেশন, উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘাত এবং ন্যাটো বাহিনীর চালকবিহীন বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা ১২ হাজার ৬৩২ জনে উন্নীত হয়েছে। আহত হয়েছে আরো ১২ হাজার ৮১৫ জন। মন্দ নয়, কি বলেন? পাঞ্জাবের মূখ্য মন্ত্রী শাহবাজ শরীফ লাহোর শহরে বোমা হামলা না চালাতে তালেবানদের প্রতি আহবান জানাতে গিয়ে বলেছেন, এই শহরের বাসিন্দারা আমেরিকানদের ঘৃণা করেন। এরপরও হলব্র“কের কাছে পাকিস্তানের রাজনীতি আগের চেয়ে ‘এখন অনেক ভালো’। সর্বশেষ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এখন আর দেশটির ‘জটিল’ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়।
এই সপ্তাহের এক সন্ধ্যায় মারগাল্লা পর্বতে যখন আধাঁর নামছিল তখন আমি ইমরান খানের সঙ্গে এক খোলা চত্বরে বসেছিলাম। আমি আপনাদের নিশ্চিত করতে বলতে পারি, তিনি পাকিস্তানের সবচেয়ে সৎ রাজনীতিকদের মধ্যে অন্যতম। পাকিস্তানে সৎ রাজনীতিকের সংখ্যা বেশি নয়। ইমরান েেভর সঙ্গে বলছিলেন, ‘আল্লাহ জানেন, ওয়াজিরিস্তানের জনগণ কত ভালো। আর আমরা তাদের সঙ্গে কী করছি?’ ইমরান খান বলেন, ‘সেনাবাহিনী তাদের আক্রমণের ল্যবস্তুর ২০ কিলোমটিার দূর থেকে কামানো গুলি ছোড়ে। ল্যবস্তুর এলাকার লোকজনকে বলা হয়, তারা ১১ জন তালেবান সদস্যকে ল্য করে গুলি করছেন। এরপর সেনাবাহিনী ঘোষণা করে, ১১ জন তালেবান সদস্য নিহত হয়েছেন। আমরা আমাদের নিজেদের মানুষকে হত্যা করছি। এটা বন্ধ করতে হবে’। ওবামা এবং তার পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এ ব্যাপারে উদাসীন এমন যুক্তি খুব একটা পাওয়া যাবেনা।
কয়েক মাস আগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যখন ওবামার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে গিয়ে বসতি স্থাপন বন্ধে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন সে সময় ওবামার পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিলারী কিনটন ঐ বসতি স্থাপনকে অবৈধ বলে মন্তব্য করেছিলেন। এছাড়া নেতানিয়াহু যখন কেবল পশ্চিম তীরে ছয় মাসের জন্য বসতি স্থাপন পরিকল্পনা স্থগিত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তখন তা প্রচারের জন্য হিলারি কিনটন আরব লীগের নেতৃবৃন্দের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তিনি এখনও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র গত দশকে ইসরায়েলকে প্রায় ২০০ ডলার দান করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা ছিল, তারা ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েলকে আবার শান্তি আলোচনায় বসাতে পারবে। এই আসা নিয়ে জো বাইডেন যখন ইসরায়েল সফরে গেছেন তখন নেতানিয়াহু সরকার পূর্ব জেরুসালেমে আরো এক হাজার ৬০০ বাড়ি নির্মাণের ঘোষণা দেয়। বাইডেনের উচিত ছিল তৎনাত বিমানে উঠে আমেরিকায় ফিরে যাওয়া। যুক্তরাষ্ট্র কি তার ছোট্ট মিডিল ইস্টার্ন প্র“শিয়াকে রার জন্য জাতিসংঘে ৩৯ বার ভেটো দেয়নি? ইসরাযেলের ভাষায়, তাদের ঘোষণা ঠেকানোর কোনো উপায় ছিলনা। নেতানিয়াহু বলেছেন, বসতি নির্মাণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে এমন বিবৃতি দেবে তা আগে থেকে তাদের জানার উপায় ছিলনা।
হিলারি কিনটন কী করেন? নেতানিয়াহুকে ফোন করে তিনি ইসরায়েলি পরিকল্পনাকে ‘উদ্দেশ্যমূলক’ ও ‘অপমানজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু এসব করার কী যুক্তি আছে? এটা ওবামা বা হিলারির জন্য অপমানজনক নয়। ইরায়েলের ঐ পরিকল্পনার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের অপমান করা হয়েছে। নেতানিয়াহুর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা এবার পূর্ব জেরুসালেমের আরো ভেতরে বসতি স্থাপন করবেন। নেতানিয়াহুকে হিলারির জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল, নির্দোষ ফিলিস্তিনিদের কেন তিনি বাস্তুহারা করছেন? হিলারি তা বলেননি। তার মনে হয়েছে, ইসরায়েল তাকে আর ওবামাকে অপমান করেছে।
আমার ধারণা, ওবামার দয়ালু দূত জর্জ মিশেলকে তার বর্তমান দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। হলব্র“কের চেয়েও ভালো ও কঠোর মনোভাব সম্পন্ন কেউ জর্জ মিশেলের স্থলাভিষিক্ত হবেন, যিনি জানেন কীভাবে আফগানিস্তান-পাকিস্তান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং কীভাবে নেতানিয়াহুকে মোকাবিলা করতে হয়। এর কারণ কি? খুব বেশি দিন আগের ঘটনা নয়। ওহাইয়োর ডেটনে এক অনুষ্ঠানে হলব্র“ক বসনিয়ার ‘শান্তি’ পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিলেন। মিলোসেভিচ ছিলেন ঐ অনুষ্ঠানের সম্মানিত অতিথি। ন্যাটো যখন সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামলো তখন কসভোবাসীরা তাদের নৃগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার অভিযান চালায়। আপনাদের হয়তো মনে আছে, কসভো আরবেনিয়ানদের তাদের বাড়িঘর ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আমরা যুদ্ধ শুরু করেছিলাম। অথচ আমাদের ইউএসএফ এবং আরএএফ যোদ্ধারা যখন সার্বিয়ার বিরুদ্ধে তাদের বোমা হামলা শুরু করেছিল তখন কসভো আলবেনিয়ানদের অধিকাংশই তাদের নিজেদের ঘরেই ছিলেন।
আমাদের এসব কথার তোয়াক্কা আজ কে করে? আমাদের শুনতে হচ্ছে, পাকিস্তান পরিস্থিতি ভালো হচ্ছে। একমাত্র আমেরিকানরাই নেতানিয়াহুকে নিয়ে হতাশ। আল-কায়েদার নেতা ও সদস্যরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আর তারা আশা করেন, আমরা যেন তাদের এসব কথা বিশ্বাস করি।

লেখক: ব্রিটেনের ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদদাতা
সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর: মেহেদী হাসান

Advertisements

March 20, 2010 - Posted by | International | ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: