My Blog My World

Collection of Online Publications

বিশেষ প্রতিবেদন: তিন সন্তানের জননী স্নায়ুবিজ্ঞানী যেভাবে আল-কায়েদা এজেন্ট হিসেবে কারাগারে

রবার্ট ফিস্ক
পাকিস্তানের ভূতাত্তি্বক ড. শামস হাসান ফারুকি তাঁর অফিসে শিলা ও ভূতাত্তি্বক রেকর্ড ঘিরে বসেন। টাক মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে তিনি আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন কিছু সময়। আমি জানতে চেয়েছিলাম, সাবেক মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল জন অ্যাশক্রফ্ট ঘোষিত বিশ্বের ‘মোস্টওয়ান্টেড’ নারী আফিয়া সিদ্দিকীর হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের খবর। ড. ফারুকি আমাকে দুঃখভরে বলেন, ‘সন্তানরা বেঁচে আছে কিনা সে নিয়ে আমি খুব সন্দিহান। সম্ভবত তারা বেঁচে নেই।’ শুনতে বিস্ময়কর মনে হয় আমার। আফিয়া পাকিস্তানে হারিয়ে গিয়েছিলেন ২০০৩ সালে। ২০০৮ সালে আবার তাঁকে অল্প সময় দেখেছেন বলে দাবি ড. ফারুকির। তিনি সম্পর্কে আফিয়া সিদ্দিকীর চাচা। আমি আবারও তাঁর কাছে হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের সম্পর্কে জানতে চাই। ড. ফারুকি আমাকে আফিয়ার ছবি দেখান। ছবিটি যখন তোলা হয়েছিল তখন আফিয়ার বয়স ছিল ১৩। সে বয়সে ইসলামাবাদের কাছে মারগাল্লা পাহাড়ে বনভোজনে গিয়েছিলেন তিনি। আল-কায়েদার সদস্যদের কথা উঠলেই আমাদের মনে তাদের যে ধরনের পোশাক ভেসে ওঠে তার কোনো ছাপ নেই আফিয়ার ওই ছবিতে। এখন তিনি পাকিস্তানে বহুলপরিচিত একজন। দেশটি হয়তো তাঁকে অপহরণের সঙ্গে জড়িত। এখন দেশই একটি মার্কিন কারাগার থেকে আফিয়ার মুক্তি চাইছে। আর তাঁর হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের কথা হয়তো সবাই ভুলতে বসেছেন।
আফিয়া সিদ্দিকীর কথা এখন পাকিস্তানে সবার মুখে মুখে ঘুরছে। এ মাসেই নিউইয়র্ক সিটির এক আদালতে এক মামলায় তাঁর ২০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। আফিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ২০০৮ সালে আফগান শহর গজনিতে একজন মার্কিন সেনাকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন। আফিয়ার বিচার আজ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায়ের প্রতীক হিসেবে মনে করা হচ্ছে। পাকিস্তানের বড় বড় সব শহরে সাঁটানো পোস্টারে লেখা আছে, ‘আমেরিকাকে ধিক্কার’। আফিয়া ‘বাগরামের ধূসর নারী’ নামে পরিচিত। আফগানিস্তানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওই নির্মম কারাগারে আফিয়ার ওপর পাঁচ বছর ধরে নির্যাতন চলেছে। পাকিস্তান-মার্কিন বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় আফিয়াকে ইসলামাবাদের কাছে হস্তান্তর করতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি মার্কিন দূত রিচার্ড হলব্রুকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি মার্কিন কারাগারে বন্দি আফিয়াকে ভূষিত করেছেন ‘ডটার অব দ্য ন্যাশন’ উপাধিতে। বিরোধীদলীয় নেতা নেওয়াজ শরীফ আফিয়ার মুক্তির দাবি জানানোর অঙ্গীকার করেছেন। তবে তাঁদের কেউই আফিয়ার তিন সন্তান_আহমেদ, সোলায়মান ও মরিয়মের ব্যাপারে কিছু বলেননি।
আহমেদ আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানে ফেরেন ২০০৮ সালে। কিন্তু ড. ফারুকি আমাকে বলেছেন, তিনি এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্বাস করেন না যে আহমেদ আফিয়ার সন্তান। তিনি বলেন, ‘সন্তান হিসেবে সে আমার সঙ্গে থাকতে এসেছে। অথচ সে নিজেই আমাকে বলেছে, গজনিতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সে আফিয়াকে চিনতই না।’ আহমেদ বলেন, ‘আফগানিস্তানে বড় এক ভূমিকম্পের সময় আমি সেখানেই ছিলাম। ভূমিকম্পে আমার ভাই-বোনেরা বাড়িতেই মারা যায়। পানি আনতে বাড়ির বাইরে যাওয়ায় আমি বেঁচে যাই।’ আহমেদ আরো জানান, ভূমিকম্পের পর তার ঠিকানা হয় কাবুলের এক অনাথ আশ্রম। সেখানেই তাকে আফিয়ার ছবি দেখানো হয়। আহমেদ আফিয়াকে আগে কখনো দেখেননি। এরপর তাকে গজনিতে নিয়ে যাওয়ার পর আফিয়ার পাশে বসতে বলা হয়। ড. ফারুকি বলেন, ‘ছেলেটি বুদ্ধিমান, সরল ও সৎ।’
এসব রহস্য নিয়ে আলোচনার আগে আরো একটি ‘গল্প’ জানানো দরকার। গল্পটি এমন, ২০০৩ সাল। স্নায়ুবিজ্ঞানী, এমআইটি অ্যালামনাস ও ব্র্যান্ডেইস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করা আফিয়া সিদ্দিকীর বয়স ৩৮ বছর। তিনি তাঁর বোনের বাড়ি থেকে করাচি বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার পর ‘হারিয়ে গেছেন’। এ সময় আফিয়ার সঙ্গে ছিল তাঁরই তিন সন্তান আহমেদ, সোলায়মান ও মরিয়ম। আমেরিকানদের অভিযোগ, আফিয়া সিদ্দিকী আল-কায়েদার একটি দল পরিচালনা করছিলেন। একই ধারণা আফিয়ার সাবেক স্বামীর। আফিয়া আম্মর আল-বালুচি নামে এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেছিলেন। আম্মর আল-বালুচি বর্তমানে গুয়ান্তানামো বে বন্দি শিবিরে বন্দি আছেন। তিনি ১৯৯৩ সালে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বোমা হামলাবিষয়ক মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রামজি ইউসুফের চাচাতো ভাই। হ্যাঁ, এই পরিচয়টুকুই সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ পরিচালনাকারী যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। ২০০৪ সালে জাতিসংঘ তাঁকে আল-কায়েদা সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করে।
কাবুলের কাছে বাগরামে কুখ্যাত মার্কিন কারাগারে বন্দি নির্যাতন যেন খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। সেখানে অন্তত তিনজন বন্দিকে হত্যা করা হয়েছে। এ কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিরা বলেছেন, সেখানে একজন নারী বন্দি অবস্থায় আছে। নির্যাতনের সময় তার আর্তচিৎকার অন্য বন্দিদের পক্ষে সহ্য করাও কষ্টকর ছিল। ওই নারীর ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে অন্য বন্দিরা অনশন পর্যন্ত করেছিলেন। ওই নারী ‘বাগরামের ধূসর নারী’ নামে পরিচিত। নিউইয়র্কে মামলা চলাকালে তিনি তার মামলার বিচারের দায়িত্বে থাকা ইহুদিদের প্রত্যাহার দাবি জানিয়েছিলেন। তার আইনজীবীরা মামলা পরিচালনা থেকে বাদ পড়ার আগে আদালতকে বলেছিলেন, নির্যাতনের ফলে আফিয়া মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। আফিয়া সিদ্দিকী আদালতে অভিযোগ করেন, গ্রেপ্ততার হওয়ার আগে গোপন কারাগারে তাঁর ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। আফিয়া আদালতে বলেছিলেন, ‘যদি আপনাকে এমন এক গোপন কারাগারে রাখা হয় যেখানে আপনার সন্তানদের হত্যা করা হয়েছে, তাহলে আপনার মানসিক অবস্থা কেমন থাকবে?’
কিন্তু আফিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের বক্তব্য হলো, ২০০৮ সালে কাবুলের দক্ষিণে গজনি শহরে আফগান পুলিশ তাকে থামায়। এ সময় তার সঙ্গে থাকা হাতব্যাগ তল্লাশি করে মার্কিন স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনাসংবলিত কাগজপত্র, গজনির মানচিত্র, রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির নিয়মাবলী ও রেডিওলজিক্যাল এজেন্ট সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যায়। এরপর আফিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মার্কিন সেনা এবং এফবিআই এজেন্টদের গজনিতে ডাকা হয়। গজনিতে আসার পর মার্কিন সেনা ও এফবিআই এজেন্টরা বুঝতে পারেননি তারা যে কক্ষে অবস্থান করছেন তারই একটি অংশ পর্দার আড়াল থেকে সব শুনছেন আফিয়া। তাদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, আফিয়া মার্কিন সেনা ও এফবিআই এজেন্টদের একটি এম-৪ অ্যাসল্ট রাইফেল ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হন এবং গুলি করা শুরু করেন। তার গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তবে সেনাদের একজনের ৯এমএম পিস্তলের দুটি গুলি তার গায়ে লাগে। এরপর আফিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন সেনাকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে বিচার হয়।
তার দ্বিতীয় স্বামী আম্মর আল-বালুচির চাচা ৯/১১ হামলার সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারী খালিদ শেখ মোহাম্মদ তাকে সাহায্য করেননি। আল-বালুচি দাবি করেছেন, আফিয়া সিদ্দিকী আল-কায়েদার সিনিয়র এজেন্ট। এখানে কতগুলো প্রশ্ন জোরালভাবেই করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রন্ডেইসের ডিগ্রিধারী একজন পাকিস্তানি আমেরিকান গজনিতে তার হাত-ব্যাগে করে মার্কিন স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ঘুরছেন_এটি কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য? আফিয়ার পরিবার যদি তাকে নিয়ে সত্যিই চিন্তিত হয় তবে কেন ২০০৩ সালে তার এবং তার সন্তানদের হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রশাসনকে জানায়নি? আহমেদ বর্তমানে করাচিতে আফিয়ার বোন ফৌজিয়ার সঙ্গে থাকছেন। তিনি আহমেদকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে দিচ্ছেন না। আমেরিকানরা আহমেদকে নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখায়নি, এমনকি তার অন্য দুই সন্তানকেও নিয়েও না_কেন?
ড. ফারুকি বলেছেন, ২০০৮ সালে গজনিতে ওই ঘটনার আগেও আফিয়া ইসলামাবাদে তার বাড়িতে এসেছিলেন। রাস্তার দিকে ইশারা করে তিনি বলেন, ‘আফিয়া বোরকা পরে এসেছিল এবং ওই জায়গাটায় গাড়ি থেকে নেমেছিল।’ ফারুকি বলেন, ‘আমরা অতীতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। সে আমাকে জানায়, আইএসআই (পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা) তাকে এখানে আসতে দিয়েছে।’ ফারুকি আরো বলেন, ‘আফিয়া তাকে বলেছিল যে তালেবারাই তাকে রক্ষা করতে পারবে। এ কারণে সে আফগানিস্তান যেতে চেয়েছিল। আফিয়া তাকে বলেছিল, গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে সে তার সন্তানদের সম্পর্কে কিছুই জানে না। তবে অনেকে আফিয়াকে বলেছেন, তার সন্তানদের অস্ট্রেলিয়া পাঠানো হয়েছে।’
আমি আরো প্রশ্ন করতে পারি। আফিয়া সিদ্দিকী যদি আফগানিস্তানে বন্দি থাকেন তাহলে তিনি কিভাবে ইসলামাবাদে ড. ফারুকির বাড়িতে আসেন? নিজ দেশের কসমোপলিটন রাজধানীতে তিনি কেন আফগান বোরকা পরে আসবেন? তিনি কেন তার সন্তানদের নিয়ে বেশি কিছু বলেননি? কেন তিনি তার চাচাকে নিজের মুখ দেখাননি? তিনি কি সত্যিই ইসলামাবাদে এসেছিলেন?
ফৌজিয়া সিদ্দিকী এখন আফিয়া সিদ্দিকীর ‘অন্যায়’ বিচার ও আমেরিকানদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার বিষয়টি দেশব্যাপী প্রচার করছেন। পাকিস্তানের গণমাধ্যমও এ খবর প্রচার করেছে। ২০০৮ সালের আগে আফিয়া সিদ্দিকী কোথায় ছিলেন_এ ব্যাপারে আমেরিকা কোনো তথ্য না দেওয়ায় পুরো বিষয়টি নিয়ে রহস্য সৃষ্টি হয়েছে।
আর আফিয়া সিদ্দিকীর সন্তানরা আজ কোথায়? তাদের নিয়ে পাকিস্তানেও তেমন একটা লেখালেখি হয়নি। তবে সম্প্রতি আফগান প্রেসিডেন্টের পাকিস্তান সফরের সময় আফিয়ার সন্তানদের বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে। ফৌজিয়ার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কারজাই পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেহমান মালিককে বলেছেন, আফিয়া সিদ্দিকীর সন্তানদের শিগগির তাদের নিজ দেশ পাকিস্তানে পাঠানো হবে। কারজাই কি আফিয়ার দুই সন্তানকে ফেরত পাঠানোর কথা বলেছেন? নাকি আসল আহমেদসহ তিন সন্তান? আফিয়ার দুই বা তিন সন্তানকে যদি আফগানিস্তান থেকে ফেরত পাঠানো হয় তবে তাদের এখন কোখায় রাখা হয়েছে? কারাগারে না অনাথ আশ্রমে? আর কারাই বা আটকে রেখেছে তাদের? আফগানরা না আমেরিকানরা?
লেখক : সাংবাদিক
ব্রিটেনের ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকা থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর: মেহেদী হাসান

Advertisements

March 20, 2010 - Posted by | International | ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: