My Blog My World

Collection of Online Publications

দূর্যোগের অপেক্ষায় বসে থেকো না

বান কি-মুন

(নিবন্ধটি ২৯ মার্চ কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে)

দূর্যোগ প্রশমন, প্রস্তুতি এবং ব্যবস্থাপনা খাতে বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগের ফলে বিগত বছরগুলোতে মানুষের মৃত্যু হার যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। চিলিতে ভবন স্থাপন নীতিমালা সময়োপযোগী। আর ঐ নীতিমালা দেশটিতে কঠোরভাবে মেনে চলা হয়েছে। এর ফলে ৮ দশমিক ৮ মাত্রার কম্পনের পরও চিলিতে মৃতের সংখ্যা কয়েক শ’য়ের মধ্যেই সীসাবদ্ধ থেকেছে। অন্যদিকে চিলির তুলনায় অনেক কম ভূমিকম্পের দেশ হাইতিতে বাড়িঘর নির্মাণে যুগোপযোগী কোনো আইন বা নীতিমালা ছিল না। এই অভাব দূর করার প্রয়োজনীয়তাই ফুটে উঠেছে হাইতির দূর্যোগে হতাহতের সংখ্যায়। রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে হাইতিতে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ চিলির ক্ষয়ক্ষতির কয়েকশ’ গুণ।

কোনো দেশই চিলি এবং হাইতির ভূমিকম্পের শিক্ষা এড়িয়ে যেতে পারে না। ভূমিকম্পের মতো দূর্যোগ আমরা ঠেকাতেও পারি না। তবে আমরা যদি আগেভাগেই দূর্যোগ থেকে সৃষ্ট সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার উদ্যোগ নেই তাহলে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ এবং হতাহতের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনতে পারি।

সম্প্রতি আমি চিলির ভূমিকম্পদূর্গত এলাকা পরিদর্শনকালে বুঝেছি, কীভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রাণে রা পেয়েছেন। চিলির জনগণের এমন সৌভাগ্যের কারণ হলো তাদের দেশের নেতৃবৃন্দ অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য দূর্যোগের ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। কেবল ভবন নির্মাণ সম্পর্কিত বিধিমালা বা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে জীবন অনেক নিরাপদ হয়েছে। এড়ানো গেছে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি এবং ক্ষয়-ক্ষতি। দূর্যোগ মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত দক্ষতা থাকায় ভূমিকম্প আঘাত হানার কয়েক মিনিটের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা দূর্গত ব্যক্তিদের উদ্ধারে এগিয়ে যেতে পেরেছেন। এই শিক্ষা সারা বিশ্বের জন্যই প্রযোজ্য। ভূমিকম্প, বন্যা, ঝড়, তাপদাহ- এসব দূর্যোগ কোনো দেশই এড়াতে পারে না। পাঁচটি মহাদেশের প্রত্যেকটিতেই নতুন নতুন প্রাকৃতিক দূর্যোগের প্রভাব পড়ছে। আমরা একে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বলে মনে করছি। বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর অনেক মানুষ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বসবাস করছে। বন্যা বা ভূমিকম্পের ফলে ঐ শহরগুলোতে খাদ্য সংকটের ঝুঁকি রয়েছে। দূর্যোগের ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে। আমি এ ব্যাপারে আশাবাদী।

প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে সৃষ্ট সঙ্কট মোকাবিলায় ২০০৫ সালে ১০ বছর মেয়াদি কর্ম পরিকল্পনা হায়োগো ফ্রেমওয়ার্ক ফর অ্যাকশন প্রণয়ন করা হয়। বিশ্বের ১৬৮ টি দেশের সরকার ঐ পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। দেশের সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরিকল্পনা, প্রশিণ এবং উন্নত শিক্ষার মাধ্যমে সম্ভাব্য দূর্যোগ চিহ্নিতকরণ এবং তা মোকাবিলার সুযোগ করে দিয়েছে হায়োগো। উদাহরণস্বরুপ স্কুল, হাসপাতাল এবং অন্যান্য সরকারি অকাঠামোতে নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করা হয়েছে। হায়োগো ফ্রেমওয়ার্কের ভিত্তিতে জাতিসংঘ দূর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করেছে। হায়োগো ফ্রেমওয়ার্ক ফর অ্যাকশন বাস্তবায়নের জন্য আমি একজন বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগ করেছি। গত বছর আমি বাহরাইনে দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলা বিষয়ক প্রথম বৈশ্বিক সমীক্ষা উপস্থাপন করেছি।

অগ্রগতি: অনেক অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে যে ভূখন্ডের নাম বাংলাদেশ সেখানে ১৯৭০ সালে এক ঘূর্ণিঝড়ে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এরপর দেশটিতে দুই হাজার পাঁচশটি আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হয় এবং প্রশিণ দেওয়া হয় ৩২ হাজারেরও বেশি স্বেচ্ছাসেবককে। এরপর ২০০৭ সালে যখন জলোচ্ছাসসহ ঘূর্ণিঝড় সিডর আঘাত হানলো তখন চার হাজারেরও কম মানুষ নিহত হয়েছে (সরকারি হিসাবে)। মিয়ানমারের এমন প্রস্তুতি ছিল না। ফলে ২০০৮ সালে সিডরের মতো সামুদ্রিক ঝড় নার্গিস মিয়ানমারে আঘাত হানলে এক লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়। ২০০৮ সালে কিউবাতে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে নয়শ’ কোটি ডলার পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হলেও হতাহতের সংখ্যা ছিল নগণ্য। এ ধরনের প্রমাণ অনেক আশাব্যঞ্জক। তবে এ ধরনের দূর্যোগের শিক্ষা মানুষ খুব দ্রুত ভুলে যায়। হায়োগো ফ্রেমওয়ার্কে যেসব প্রস্তাবনা রয়েছে সে অনুযায়ী বাস্তবসম্মত পদপে নিতে ব্যর্থ হয়েছে অনেক সরকার। অনেক দেশ যুক্তি দেখিয়েছে, সংকট প্রতিরোধ মডেল বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ তাদের হাতে নেই। আমি বলি, কোনো দেশই ঐ মডেল অস্বীকার করতে পারবেনা।

আমরা জানি, দূর্যোগ প্রতিরোধ প্রকৃত অর্থে অনেক দেশের ভবিষ্যত ক্ষয়ক্ষতি বাঁচিয়ে দেয়। বন্যা মোকাবিলায় চীন ১৯৬০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ৩১৫ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। এর ফলে দেশটি প্রায় ১২শ’ কোটি ডলার তি থেকে রা পেয়েছে। ব্রাজিল, ভারত, ভিয়েতনামসহ বিশ্বের অনেক দেশ এ ধরনের ভবিষ্যত ক্ষয়-ক্ষতি থেকে নিজেকে রক্ষা করেছে।

প্রত্যেকেরই একটি ভূমিকা আছে। চলমান সংকট এবং আকস্মিক আঘাত মোকাবিলায় জনগণকে দক্ষ করে তুলতে সরকার, জাতীয়, স্থানীয়- সব কর্তৃপক্ষকে কাজ করতে হবে। বন্যা এবং ভূমিকম্প প্রবণ এলাকায় সমাধান হলো বাড়ি-ঘর নির্মাণে যুগোপযোগী বিধিমালা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করা। বন্যা বেশি হয় এমন এলাকায় বিধিমালার সঙ্গে সঙ্গতি নেই এমন বাড়ি-ঘর অন্যত্র স্থানান্তর বা উন্নয়ন, উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভের মতো প্রাকৃতিক বেস্টনি, নগরের দরিদ্রদের অধিকতর উপযোগী ভূমি ও উন্নত অবকাঠামো এবং কার্যকর পূর্বাভাস দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এসব ব্যবস্থা নেওয়া হলে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন রা পাবে। দূর্যোগ মোকাবিলায় জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রস্তুতি নিতে জাতিসংঘ সরকারগুলোকে সাহায্য করতে প্রস্তুত আছে।দূর্যোগ মোকাবিলায় দাতা দেশগুলোর তহবিল গঠণ করা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর অর্থ হলো দূর্যোগ নিরসন, প্রস্তুতিগ্রহণ এবং ব্যবস্থাপনা খাতে বিনিয়োগ করা।

হাইতি এবং চিলি আমাদের আবারো দেখিয়েছে, কেন একই দূর্যোগের আঘাতে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ দেশ ভেদে ভিন্ন হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বিপর্যয়ে রুপ নেওয়ার তা মোকাবিলায় আমাদের শীগগীরই পদপে নিতে হবে।

লেখক: জাতিসংঘ মহাসচিব

ভারতের হিন্দু পত্রিকা থেকে ভাষান্তর: মেহেদী হাসান

Advertisements

March 29, 2010 - Posted by | Global Warming, Peace | , , ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: