My Blog My World

Collection of Online Publications

শোয়েব, সানিয়া আর অবলিজাবোতা


জাভেদ নাকভি
(নিবন্ধটি ২ এপ্রিল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে)
পাকিস্তানের ক্রিকেট খেলোয়াড় শোয়েব মালিক এবং ভারতের টেনিস খেলোয়াড় সানিয়া মির্জা বিয়ে করে দুবাইয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের ঘোষণা দিয়েছেন। মনে হয়, দুবাইয়ের এমন কিছু গুণ আছে, যা প্রত্যেকের জটিল সমস্যাগুলো সমাধান করে দেয়। শোয়েব মালিক তার ‘পাকিস্তানি’ জাতীয়তা বিসর্জন দেবেন না। সানিয়া মির্জাও রাখবেন তার ‘ভারতীয়’ নাগরিকত্ব। তাদের দু’জনই যতদিন সম্ভব নিজ দেশের পক্ষে খেলা চালিয়ে যেতে চান। কেবল এই উপমহাদেশ নয়, ইউরোপ এবং বিশ্বের সর্বত্র শোয়েব-সানিয়া ভক্তদের আগ্রহ থাকবে এই হবু দম্পতিকে নিয়ে।
বিয়ের পর বেশ কয়জন ভারতীয়-পাকিস্তানি যুগল দুবাইয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করেছেন_এমনটা আমি জানি। কারণ অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব নিতে গেলে তাদের পাসপোর্ট বদলাতে হতো এবং আবার নিজের পুরনো দেশে বেশি দিন থাকতে হলে দীর্ঘমেয়াদি ভিসার জন্য তাদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পোহাতে হতো। অনেক বছর আগে পাকিস্তানের স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান মহসিন খান বিয়ে করেছিলেন ভারতীয় অভিনেত্রী রিনা রায়কে। তারা স্থায়ীভাবে দুবাইয়ে বসবাস না করলেও শারজায় ক্রিকেট ম্যাচের কারণে তাদের প্রায়ই আসতে হয়েছে। তাদের বিয়ের পর দলের প্রতি মহসিনের আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান দুই দলেই অবিশ্বাস্য এক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। পাকিস্তানিরা মহসিনের নাম দিয়েছিল ‘জিজা’ বা ভগি্নপতি। ভারত বনাম পাকিস্তানের একটি ম্যাচের কথা আমার মনে আছে। ক্রিজের অপর প্রান্তে থাকা ব্যাটসম্যানকে এক রান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন মহসিন। শারজা স্টেডিয়ামের পাকিস্তানি দর্শক ও ভক্তরা সে সময় চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘না, না। জিজা তোমাকে রানআউট করবে।’ সেদিন সত্যিই মহসিনের পার্টনার রানআউট হয়েছিলেন। আমি জোর দিয়ে বলব, ওই রানআউটের জন্য মহসিন দায়ী ছিলেন না।
৮০-এর দশকে দুবাই যেসব ভালো কাজ করছে সেগুলোর মধ্যে ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কোন্নয়ন অন্যতম। এই সেই দুবাই যেখানে আমি খালিজ টাইমস এবং গালফ নিউজ পত্রিকায় উপমহাদেশের সেরা সম্পাদকদের সঙ্গে কাজ করেছি। মানিকানন্দ চলাপতি রাও এবং ফ্র্যাঙ্ক মোরেসের মতো খ্যাতিমান সম্পাদকদের যুগ ভারতে শেষ হয়েছে। তবে সাংবাদিকদের উপর অব্যাহত নির্যাতনের কারণেই হয়তো এখনও পাকিস্তানে বিপ্লবী সম্পাদকদের জন্ম হয়। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের আমলে আজিজ সিদ্দিকী নামে এক সম্পাদককে কারাগারে যেতে হয়েছিল।
দুবাইয়ে ভারতীয় এবং পাকিস্তানি উভয়ের মধ্যেই উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই দেশের নাগরিকরা এখানে প্রায়ই অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে অনেক কাজ করেন। একত্রে কাজ করতে গিয়ে জাতীয়তা এবং নৃতাত্তি্বক গোষ্ঠীগত ব্যবধান দূর হয়ে গেছে। দুবাইয়ের সমৃদ্ধ এ অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আকৃষ্ট করেছে। তাদের অনেকে সেখানে অর্থ সংগ্রহের জন্য আসতেন। কূটনীতিকরা এসব বিষয়ে নজর রেখেছেন। ভারতীয় কনস্যুলেটে আমার এক বন্ধু ছিল। আমার প্রতিবেদনের প্রতি তার আগ্রহ দেখে আমি ধারণা করেছি, সে গোয়েন্দা ইউনিটে কাজ করে। আমার এক প্রতিবেদনের ব্যাপারে সে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের (আফগান মুজাহিদিন নেতা) সঙ্গে তুমি কোথায় দেখা করেছ?’ সে সময় সবার ধারণা ছিল, আফগান মুজাহিদিনরা অর্থ সংগ্রগের জন্য দুবাই আসত। আর দুবাইয়ে তাদের থাকা নিয়ে কোনো সমস্যা হতো না।
একদিন শারজায় ক্রিকেট ম্যাচের সময় মাঠের এক প্রান্তে আমরা এমন একটি ব্যানার দেখেছিলাম যেখানে লেখা ছিল, ‘জেকেএলএফ (জম্মু-কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট) দীর্ঘজীবী হোক’। পরদিন পত্রিকায় ছবিটি প্রকাশিত হয়েছিল। পরদিন আমার প্রত্যাশা অনুযায়ীই সেই বন্ধু কোনো রকম ভনিতা না করেই জানতে চাইল, ‘তোমরা কখন ব্যানারটি দেখেছিলে?’ আমি উত্তর দিয়েছিলাম, ‘তুমি যখন দাউদ ইব্রাহিমের (মাফিয়া ডন) সঙ্গে করমর্দন করছিলে তখন আমি ওই ব্যানার দেখেছি।’
দুবাই নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। এই বিতর্ক ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড ফেরার দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে দুবাইয়ে তার মদদদাতা রাজনীতিক, চিত্রতারকা এবং ক্রিকেট ভক্তদের উপস্থিতি নিয়ে। উপমহাদেশের রাজনীতিকদের কাছে নিরপেক্ষ ও বিশ্বস্ত স্থান হিসেবে দুবাইয়ের বেশ কদর আছে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হকের আমলে দুবাই সাফল্যের সঙ্গে পলাতক সাংবাদিক এবং অন্য পেশাজীবীদের সম্মানের সঙ্গে রেখেছিল। তবে আমার মনে হয়, দুবাইয়ের শাসকরা পাকিস্তানের ভুট্টো পরিবার এবং ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি বেশ সহানুভূতিশীল ছিল। শাসক শেখ রশিদ বিন সাঈদ আল মক্তুমের শেষ রাষ্ট্রীয় অতিথি ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। সে সময়ের একটি গল্প আজও শোনা যায়। ইন্দিরা গান্ধী দুবাইয়ে ভারতীয় কর্মজীবী শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলেও সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর চাপ এবং কনসাল জেনারেল ও পি গুপ্তর (O P Gupta) কারণে তা সম্ভব হয়নি। এর কয়েক সপ্তাহ পর ওই কূটনীতিক দুবাইয়ে রাশ আলখাইমার শাসকের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সরকারি বার্তা সংস্থা ওই ছবি এবং আরবিতে তার ক্যাপশন প্রকাশ করে। ইংরেজি ‘জি (G)’ ও ‘পি (P)’ বর্ণের আরবি উচ্চারণ না থাকায় সুদানি অনুবাদক লিখেছিলেন ওবি জাবোতা (Obi Jabota)। এরপর মুদ্রাকর এবং বানান সংশোধনকারীদের ভুলে ইংরেজি ‘এল’ এবং ‘আই’ বর্ণ যোগ হয়ে কনসাল জেনারেলের নাম দাঁড়ায় ‘অবলিজাবোতা’ (Obolijabota)। ওই ভুলের জন্য আমি দায়ী ছিলাম না বলে গালফ নিউজের সম্পাদক নিশ্চিত থাকলেও কনসাল জেনারেল তা কখনো বিশ্বাস করেননি। শোয়েব মালিক এবং সানিয়া মির্জাকে অন্তত ওই কূটনীতিকের মতো সমস্যায় পড়তে হবে না। তাদের দু’জনের নামই আরবিতে লেখা যায়।
লেখক : সাংবাদিক
নিবন্ধটি পাকিস্তানের ডন পত্রিকা থেকে নেওয়া।
সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর : মেহেদী হাসান

Advertisements

April 2, 2010 - Posted by | International, Media, National, Sports | , , ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: