My Blog My World

Collection of Online Publications

ভারতে মনমোহন সরকারের ৫০০ দিন : অনুজ্জ্বল শাসন

কূলদীপ নায়ার

(নিবন্ধটি ৫ এপ্রিল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে)

ভারতের মনমোহন সিং সরকারের বয়স প্রায় ৫০০ দিন হতে চলল। এরই মধ্যে মনে হচ্ছে, সরকার তার ক্ষমতা ও প্রাণশক্তি হারাচ্ছে। ৫৪৫ আসনের লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়নি। এটা বরাবরই মনমোহন সিংয়ের দলের ক্ষেত্রে হয়েছে। এর আগেরবারও এ দলের ক্ষেত্রে এমনটা হয়েছিল। তবে বর্তমানের মতো অনুজ্জ্বল শাসন কখনো ছিল না। জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি আবারও চালু করার মাধ্যমে কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী সরকারকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর এ উদ্যোগ বিপরীত ফল বয়ে আনতে পারে। সব কাজের জন্য সোনিয়া গান্ধীর জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হলে সরকার আরো দুর্বল হবে।
মনমোহন সিংয়ের সরকার আগেরবার ক্ষমতায় থাকাকালে ভারত-মার্কিন পরমাণু বিল নিয়ে অনাস্থা ভোটে জয়ী হয়েছিল। এবারের মেয়াদে মনমোহন সরকার পরমাণু দায়বদ্ধতা বিলটি পার্লামেন্টে তোলার পরও সম্ভাব্য অনাস্থা ভোটে হেরে যাওয়ার ভয়ে তা প্রত্যাহার করে নেয়। এ ছাড়া বিচারকদের জবাবদিহিতা বিলটি কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই প্রত্যাহার করে নিয়ে মনমোহন সিংয়ের কংগ্রেস দল তার নড়বড়ে অবস্থানই প্রকাশ করেছে। এমনকি নারী আসন সংরক্ষণ বিষয়ক বিল রাজ্যসভায় পাস হওয়ার পরপরই মনমোহন সিংয়ের সরকার তা লোকসভায় নিয়ে যায়নি।
প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং প্রকাশ করা হয়নি এমন অনেক বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সরকার নারী আসন সংরক্ষণ সম্পর্কিত বিল পাসের নিশ্চয়তা পেলেই তা লোকসভায় উপস্থাপন করবে। বিলের পক্ষে-বিপক্ষে কতসংখ্যক ভোট পড়বে, সরকার এখন সে হিসাবই কষছে। মুসলমান ও সংখ্যালঘু বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কোটা চালুর দাবি আরো জোরদার হয়েছে, বিশেষ করে রেলমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি কোটা প্রথার দাবির প্রতি সমর্থন জানানোর পর তা নতুন গতি পেয়েছে। আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গে অনুষ্ঠেয় রাজ্যসভা নির্বাচনে মুসলমান ভোটারদের সমর্থন পেতে চাইছেন মমতা। কংগ্রেসও তাঁকে অসন্তুষ্ট করবে না। কারণ, মমতার সমর্থন কংগ্রেস দলের জন্য এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে। গত কয়েক মাসে দ্রব্যমূল্য ১৬ শতাংশ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির বাহাদুরিতেও পেট্রল, ডিজেলের দাম কমছে না। বিরোধীদের কাছ থেকে চ্যালেঞ্জের আশঙ্কায় কংগ্রেস তার সদস্যদের পার্লামেন্টে উপস্থিত থাকতে বলেছে। অর্থাৎ কেবল কাগজেই টিকে আছে মনমোহন সরকার।
২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার সময়ই আইনের শাসন এবং জনগণের সুরক্ষার মতো জটিল কিছু বিষয়ে জনগণের দৃষ্টি পড়ে। রাষ্ট্রের দেওয়া নিরাপত্তাব্যবস্থায় জনগণ আশ্বস্ত হতে পারছিল না। দীর্ঘদিন পর আবার দাঙ্গা হয়েছে হায়দরাবাদে। ভারতের ছয় ভাগের এক ভাগ শাসন করার মতো ক্ষমতা আছে বলে দাবি করছে মাওবাদীরা। এই সমস্যা বড় হয়ে উঠছে। মাওবাদীদের মোকাবিলায় সরকার জনগণের জন্য সেবাধর্মী বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে মাওবাদীদের উচ্ছেদ করার পর স্থানীয় জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম। তবে সরকারের উদ্যোগ ও আশ্বাস খুব একটা কাজে আসেনি। মাওবাদীদের কর্মকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী উপজাতীয় জনগণ। তাদের এখনো প্রায় সব সময়ই মাওবাদীদের বন্দুকের নলের গোড়ায় জীবন যাপন করতে হয়। মাওবাদীদের সঙ্গে সরকারের বিরোধ দেখে যাওয়া ছাড়া ভারতের জনগণের আর কোনো উপায় থাকবে না_এমন সিদ্ধান্তে পেঁৗছা ভুল হবে। বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন গ্রুপ বৈঠক করে মাওবাদী সমস্যার যুক্তিযুক্ত সমাধান খুঁজছে। তাদের চিন্তার মূল বিষয় হলো সংঘাত পরিহার করে সামাজিক গণতন্ত্র এবং জনগণের অর্থনৈতিক মঙ্গল নিশ্চিত করা।
দুই পক্ষের মধ্যস্থতার অংশ হিসেবে সম্প্রতি এলাহাবাদে প্রায় ২৫০ জন কর্মী মাওবাদীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। মাওবাদীরা নিজেদের সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে সজাগ থাকলেও ওই আলোচনায় কোনো সমাধানে পেঁৗছানো সম্ভব হয়নি। তাদের প্রস্তাব ছিল, ‘জনগণের পার্লামেন্ট’ প্রতিষ্ঠা করা। মনোনীত পার্লামেন্ট দেশের দায়িত্ব নেবে না। প্লেটোর দর্শন অনুযায়ী, দেশ চালানোর দায়িত্ব থাকবে মেধাবী ও বুদ্ধিজীবীদের। অবশ্য সেটা প্রায় অসম্ভব এক স্বপ্ন। তবে জনগণের পার্লামেন্টে মনোনীত খ্যাতনামা ব্যক্তিদের কোনো প্রভাব থাকবে না নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর। বেসরকারি সংস্থাগুলো (এনজিও) ভোটের রাজনীতি করতে পারবে না। জনগণের আন্দোলন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বিষয় নিয়েই পরিচালিত হবে। এটাই শেষ নয়, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হবে নির্বাচনের মাধ্যমে। মাওবাদী কর্মীরা যত দিন এই নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করবেন বা নির্বাচন থেকে দূরে থাকবেন, তত দিন তাঁরা ক্ষমতা থেকে দূরে থাকবেন।
লক্ষ্যপূরণে মাওবাদীদের সব ধরনের সংগ্রাম করতে হবে। তবে মূল লক্ষ্য রাখতে হবে নির্বাচনের দিকে। কেননা, পার্লামেন্টে পেঁৗছতে না পারলে তারা সরকারের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না। সংবিধানে উলি্লখিত শাসনব্যবস্থা যথাযথভাবে চলছে না_এটাই মূল সমস্যা। রাষ্ট্র ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। মাওবাদী গোষ্ঠীর কর্মী ও সমর্থকরা যদি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে পার্লামেন্ট জয়ের পরিকল্পনা না করে, তাহলে কিভাবে এমন সরকার বদলানো সম্ভব হবে? জনগণ ও রাজনীতির মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব, সরকারের কর্তৃত্বপরায়ণতা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অপব্যবহারের কারণে জনগণের ক্ষোভ বাড়ছে।
সরকারের প্রধান তিনটি স্তম্ভ (নির্বাহী, বিচার ও শাসন) ঘুষ, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সংবিধানে জনগণের অধিকার স্বীকৃত। কিন্তু তা বাস্তবায়নের পরিমাণ সীমিত। চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যমও যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে না। অর্থের বিনিময়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে, এটি স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য প্রহসন। শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে সরকারের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
নাগরিকদের গুরুত্ব দিয়ে সুশাসন নিশ্চিত করাই যদি আমাদের উদ্দেশ্য হয়, তাহলে ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার কথা ভাবতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যা দেশের প্রকৃত প্রতিনিধিদের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেবে।
লেখক : ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক। নিবন্ধটি টাইমস অব ইন্ডিয়া থেকে নেওয়া। সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর : মেহেদী হাসান

Advertisements

April 5, 2010 - Posted by | International, Political | , , , ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: