My Blog My World

Collection of Online Publications

কিরগিজস্তান এবং মধ্য এশিয়ার জন্য যুদ্ধ

রিক রজফ

(নিবন্ধটি ৯ এপ্রিল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে)

পাঁচ বছর আগে এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিলেন কিরগিজ প্রেসিডেন্ট কারমানবেক বাকিয়েভ। গত বুধবার অনুরূপ এক অভ্যুত্থানে উৎখাত হলেন তিনি। অর্থাৎ কারমানবেক যেভাবে রাষ্ট্রপ্রধানের পদে এসেছিলেন, ঠিক সেভাবেই বিদায় নিলেন। আফগানিস্তানে মার্কিন এবং ন্যাটো বাহিনীর অভিযানের মূল ট্রানজিট রাষ্ট্র কিরগিজস্তানে ২০০৫ সালে তথাকথিত টিউলিপ বিপ্লবের দুই মাস পর তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।
গত বছরের জুন মাসে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর এক প্রকাশনায় বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালানোর জন্য কিরগিজস্তানের মানাসকে মূল ট্রানজিট সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই পেন্টাগন মানাস বিমানঘাঁটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়েছে। ওই ঘাঁটিকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে মার্কিন-ন্যাটো জোট বাহিনীর এক লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি সেনা আফগানিস্তানে যাওয়া-আসা করেছে। এ ছাড়া সামরিক অভিযান চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় পাঁচ হাজার টন রসদও আফগানিস্তানে গেছে মানাস বিমানঘাঁটি থেকে। বর্তমানে ওই ঘাঁটিতে প্রায় এক হাজার মার্কিন সেনা এবং স্পেন ও ফ্রান্সের কয়েক শ সেনা রয়েছে। আফগানিস্তান এবং পাকিস্তান বিষয়ে হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত রিচার্ড হলব্রুক গত ফেব্রুয়ারি মাসে কিরগিজস্তানসহ সাবেক সোভিয়েত মধ্য এশীয় তিনটি প্রজাতন্ত্র কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান এবং উজবেকিস্তান সফর করেছেন। মানাস বিমানঘাঁটি সফরকালে তিনি বলেন, প্রতি মাসে ওই ঘাঁটি ব্যবহার করে ৩৫ হাজার মার্কিন সেনা আফগানিস্তানে যাচ্ছে। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, মানাস থেকে প্রতিবছর আফগানিস্তানে যাচ্ছে চার লাখ ২০ হাজার সেনা।
দক্ষিণ এশিয়ায় যুদ্ধ বা অভিযান চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো তাজিকিস্তান এবং উজবেকিস্তানেও ঘাঁটি গড়েছে।
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কিরগিজ সরকার মার্কিন এবং ন্যাটো বাহিনীকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু সে বছরের জুন মাসে ওয়াশিংটন ছয় কোটি ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দিলে কিরগিজ সরকার আগের সিদ্ধান্ত বাতিল করে। তবে মার্কিন বাহিনীকে কিরগিজস্তান ছাড়তে বলার কারণেই দুই দেশের সরকারের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কেবল চীন নয়, কিরগিজস্তানের সীমান্ত আছে কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান এবং উজবেকিস্তানের সঙ্গেও। রাশিয়া এবং কিরগিজস্তানের মধ্যে আছে মাত্র একটি দেশ_কাজাখস্তান। প্রতিবেশী দেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে লাখ লাখ ভিনদেশি সেনা অবাধে যাতায়াত করলে চীন এবং রাশিয়ার উদ্বেগ থাকা অযৌক্তিক কিছু নয়। মেক্সিকো ও গুয়াতেমালা দিয়ে চীন ও রাশিয়ার সেনা চলাচল করলে যুক্তরাষ্ট্রেরও এমন উদ্বেগ হতো। তাই কিরগিজস্তানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা আছে বলেও অনেকে মনে করতে পারেন।
রাশিয়া, আর্মেনিয়া, বেলারুশ, কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তানের জোট_কালেক্টিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশনকে (সিএসটিও) অনেকে সাবেক সোভিয়েত-শাসিত অঞ্চলে ন্যাটোর অনুরূপ চুক্তি বলে মনে করেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে টিউলিপ বিপ্লবের সময় এবং পরে মানাস বিমানঘাঁটি থেকে বিমান উড্ডয়নে কোনো বিলম্ব হয়নি। এমনকি কোনো ফ্লাইট বাতিল করা হয়নি। অথচ সিএসটিওভুক্ত দেশগুলোতে বিমান চলাচলে বিলম্ব হয়েছে এবং অনেক ফ্লাইটের যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। ২০০৫ সালের মার্চ মাসে প্রেসিডেন্ট আসকর আকিয়েভকে উৎখাতে যে বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, তা ছিল মাত্র ১৬ মাসের মধ্যে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে তৃতীয় রঙিন বিপ্লব। ২০০৩ সালে ‘রোজ’ বিপ্লব হয়েছিল জর্জিয়ায়, ২০০৪ সালের শেষদিক থেকে ২০০৫ সালের শুরুর দিকে ‘অরেঞ্জ’ বিপ্লব হয়েছিল ইউক্রেনে। পশ্চিমা গণমাধ্যমের কিরগিজ সংস্করণে কয়েক দিন ধরে বলা হচ্ছিল, ‘পরবর্তী বিপ্লব কোথায়?’
সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এম কে ভদ্রকুমার রঙিন বিপ্লব সম্পর্কে বলেছেন, জর্জিয়া, ইউক্রেন, কিরগিজস্তান,_এই তিন দেশই সাবেক সোভিয়েত রাশিয়া অঞ্চলে অবস্থিত। ওয়াশিংটন ওই অঞ্চলে তার প্রভাব জোরদার করছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাল্টিক, ককেশাস, মধ্য এশিয়া নিয়ে রাশিয়ার উদ্বেগ বেড়েছে।
ভদ্রকুমার আরো লিখেছেন, কিরগিজস্তানে সরকার পরিবর্তনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাবের সঙ্গে একমত পোষণ না করায় ইতিপূর্বে জর্জিয়া, ইউক্রেন এবং কিরগিজস্তানে সরকার উৎখাত করা হয়েছে। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়ার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করাই ওই সরকারগুলোর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
২০০৫ সালে ক্ষমতা থেকে উৎখাত হওয়ার আগে কিরগিজ প্রেসিডেন্ট আকিয়েভ বলেছেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল টিউলিপ বিপ্লবে ইন্ধন জোগানোর পাশাপাশি আর্থিক সাহায্য দিচ্ছে।
শীতল যুদ্ধের চার দশকে বিশ্বের যেকোনো দেশের সরকারের সামনে একটি প্রশ্ন ছিল। প্রশ্নটি হলো সরকার মার্কিনপন্থী, না সোভিয়েত পন্থী? শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এখনো একটি প্রশ্নের উত্তর বিশ্বের প্রায় সব দেশের সরকারকে তার কাজের মাধ্যমে দিতে হয়। এ প্রশ্ন হলো, তাদের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাকে সমর্থন করে কি না?
গত বুধবার কিরগিজস্তানে যে সরকারের পতন হলো, সেটিও ওয়াশিংটনের রোষানলে পড়েছিল কি না সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ২০০৫ সালে টিউলিপ বিপ্লবের পরবর্তী সরকার উৎখাত করা নতুন সরকার নিজেকে ‘জনগণের সরকার’ বলে দাবি করছে। সরকারের প্রধান মুখপাত্র রোজা ওতুনবায়েভা (সম্ভাব্য সরকারপ্রধান) বলেছেন, টিউলিপ বিপ্লবের ফসল বাকিয়েভকে উৎখাত করায় ওয়াশিংটন যে অসন্তুষ্ট হবে না, তা মনে করার মতো অনেক কারণ আছে। ক্ষমতা দখলের পর পরই তড়িঘড়ি করে ‘জনগণের সরকার’ ঘোষণা দিয়েছে, মানাস বিমানঘাঁটি বন্ধ করা হবে না।
এই ওতুনবায়েভাই ২০০৫ সালে টিউলিপ বিপ্লব-পরবর্তী সরকারের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইসের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। ওই বৈঠকে নতুন সরকারকে সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন রাইস।
ধারণা করা হয়, কিরগিজস্তান থেকে মার্কিন ঘাঁটি সরিয়ে নিতে বলাই কাল হয়েছে উৎখাত হওয়া সরকারের জন্য। তবে এই সরকার উৎখাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে কে? মার্চে গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর জর্জিয়ার মিখাইল সাকশাভি বলেছেন, ‘রোজা ওতুনবায়েভা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবখাজিয়ায় জাতিসংঘ অফিসের প্রধান হিসেবে তিবলিশিতে কাজ করেছেন। রোজ বিপ্লবের সময় তিনি জর্জিয়ায় ছিলেন এবং জানতেন কী হচ্ছে। কিরগিজস্তানে ক্ষমতার পালাবদলের পেছনে জর্জিয়ার ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে রোজা ওতুনবায়েভা বেশ বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি।’
এদিকে রাশিয়াও কিরগিজস্তানে তার বিমানঘাঁটির সদস্যদের সতর্ক অবস্থায় রেখেছে। কিরগিজস্তানের নতুন সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর মধ্য এশিয়ার ভাগ্য নির্ভর করছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো আগামী দুই মাসের মধ্যে আফগানিস্তানের কান্দাহারে বড় ধরনের যে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করেছে, কিরগিজ পরিস্থিতি তাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি কালেক্টিভ সিকিউরিটি ট্রিটি অর্গানাইজেশন এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের ভবিষ্যৎও নির্ভর করছে নতুন কিরগিজ সরকারের ওপর।
লেখক: সাংবাদিক
নিবন্ধটি অস্ট্রেলিয়া ডট টিও নিউজ থেকে নেওয়া। সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর : মেহেদী হাসান

Advertisements

April 9, 2010 - Posted by | Foreign Affairs, International, Peace, Political | , ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: