My Blog My World

Collection of Online Publications

পোল্যান্ড : অভিশপ্ত কাতিনের ফের জেগে ওঠা

(নিবন্ধটি ১২ এপ্রিল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে)

উড়ন্ত এক কফিনে চড়ে কাতিনের উদ্দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট লেখ্ কাতিন্স্কিসহ তাঁর সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা। কিন্তু অভিশপ্ত কাতিন উডসের গণকবর যেন আবার জেগে উঠেছিল। ১৯৪০ সালের গণহত্যা স্মরণ করার সুযোগ পোল্যান্ডের জনগণ ১৯৮৯ সালের আগে পায়নি। গণহত্যার সেই স্মৃতি আর শোক কাটিয়ে ওঠার আগে পোল্যান্ডের জনগণের জন্য নতুন দুর্যোগ হয়ে এসেছে কাতিন্স্কিসহ সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের আকস্মিক মৃত্যু। পোল্যান্ডে এখন চরম সংকট, নেতৃত্বের শূন্যতা। অভিশপ্ত কাতিন উডস অতীতে কেড়ে নিয়েছিল পোল্যান্ডের ২০ হাজার মানুষ। এবার তাদের গণকবরই যেন টেনে নামিয়েছে উড়ন্ত কফিন-বিমানকে। পোল্যান্ডের গণতন্ত্র নিয়ে শঙ্কা দেখা দিলেও সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে পোল্যান্ড-রাশিয়া সম্পর্কোন্নয়নের। এসব বিষয়ে ওয়ার, বিজনেস জার্নালে অ্যান্ড্রু কুরেথ, ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল ব্লগে মার্সিন সবজিক, নিউইয়র্ক টাইমস নিউজ ব্লগে লিজ রবিন্সের নিবন্ধের নির্বাচিত অংশ ভাষান্তর করেছেন মেহেদী হাসান

উড়ন্ত কফিন

রাশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে যে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট লেখ্ কাতিন্স্কি নিহত হয়েছেন খোদ পোলিশ কর্মকর্তাদের কাছেই তার নাম ছিল ‘উড়ন্ত কফিন’। সোভিয়েত আমলের ওই সামরিক বিমানটি বেশ কয়েকবার দুর্ঘটনায় পড়ে ওই নাম পেয়েছিল। এর পরও ভিন দেশের মাটিতে ওই দুর্ঘটনাটি যদি ২০ বছর আগে ঘটত, তবে একবাক্যে সবাই একে নাশকতা বলে আখ্যায়িত করতেন। তবে ইউরোপ তথা বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নাশকতার ভাবনা নিছক বাড়াবাড়ি। বিধ্বস্ত বিমানের ব্ল্যাক বক্স থেকে এ পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে মনে হয়েছে, পাইলটের ভুলের কারণেই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

প্রেসিডেন্ট কাতিন্স্কি এবং তাঁর সরকারের শীর্ষপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা ও নেতা নিহত হওয়া কেবল বিশ্বকেই নাড়া দেয়নি, যেন ইতিহাসেরও পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে ২০ হাজারেরও বেশি পোলিশ সেনার হত্যাযজ্ঞের বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন পোল্যান্ডের নেতারা। তাঁদের বহনকারী বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার স্থান সম্পর্কে সাবেক প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার কাওয়াসনিয়েস্কি যুক্তরাজ্যের টাইমস পত্রিকাকে বলেছেন, ‘এটি একটি অভিশপ্ত জায়গা। এর কথা ভাবলেই আমার গা শিউরে ওঠে’। জায়গাটির নাম কাতিন উডস। এর অবস্থান রাশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় স্মোলেন্স্ক এলাকায়। ১৯৪০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পোল্যান্ড আক্রমণ করার পর কাতিন উডসে অনেক সেনাকে হত্যা করা হয়। ঐ হত্যাযজ্ঞের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে শীর্ষ সামরিক এবং বেসামরিক কর্মকর্তারাও ছিলেন। এদিকে গত শনিবার কাতিন উডসে বিধ্বস্ত হওয়া বিমানে ছিলেন পোল্যান্ডের এ সময়ের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই। ছিলেন প্রেসিডেন্টের স্ত্রী মারিয়াও। ফার্স্ট লেডি মারিয়ার চাচা ১৯৪০ এর দশকে কাতিন উডসে সোভিয়েত সেনাদের হাতে নিহত হয়েছিলেন। এবার সেই অভিশপ্ত স্থানে নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছে পোল্যান্ড।

উন্নত হবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক

কাতিন উডসে পোলিশ সেনা ও রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে সোভিয়েত বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ গত কয়েক দশক ধরে পোলিশ-সোভিয়েত সম্পর্কের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সাবেক সরকারের হত্যাযজ্ঞ স্বীকার করতে মস্কোর ৫০ বছর লেগেছে। রুশ প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির পুতিন গত বুধবার পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে সোভিয়েত বাহিনীর হাতে নিহত পোলিশদের আত্দত্যাগের কথা স্মরণ করেন। এই প্রথমবারের মতো কোনো রুশ নেতা হত্যাযজ্ঞের স্বীকার হওয়া পোলিশদের স্মরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেন। আর এ ঘটনাকে দুই দেশের সম্পর্কের অগ্রগতির পথে বড় মাইলফলক বলে মনে করেছিলেন বিশ্লেষকরা। কাতিন উডসে হত্যাযজ্ঞের পর ৭০ বছর পেরিয়ে গেলেও তার দায়বদ্ধতা নিয়ে এখনো রাশিয়ায় আলোচনা হচ্ছে। এমনকি তৎকালীন সোভিয়েত সরকারের ওই বিতর্কিত ভূমিকার জন্য পুতিন দুঃখ প্রকাশ করবেন_এমনটাও চায়নি রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি। প্রেসিডেন্ট কাতিন্স্ক্রি নীতি অনেক সময় রুশ কর্তৃপক্ষের মনঃপূত হয়নি। এমনকি পোলিশদের হত্যাযজ্ঞের বার্ষিকীতে তিনি নিমন্ত্রণও পাননি। তবু তিনি স্মোলেন্স্ক্ যাচ্ছিলেন, ওই হত্যাযজ্ঞ স্মরণে আয়োজিত পৃথক একটি অনুষ্ঠানে। পোল্যান্ডের ওয়ারস থেকে যে বিমানে চড়ে তিনি রওনা হয়েছিলেন, তা ছিল রুশ নকশার। ওই বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর রুশ-পোলিশ সম্পর্কে অবনতি হওয়ার বদলে সম্পর্ক আরো ভালো হবে বলে আশা করছেন ইতিহাসবিদরা। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ব্রায়ান পর্টার-সুস মনে করেন, ওই ভয়াবহ ঘটনা থেকে যদি কোনো ভালো ফল আসে, তা হবে দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়ন। পর্টার-সুসের সাবেক সহকর্মী, বর্তমানে ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পরিচালক মিশেল ডি কেনেডি বলেছেন, দুর্ঘটনার পর রুশ এবং পোলিশ গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন দেখে দুদেশের সম্পর্কোন্নয়নের ব্যাপারে তিনি বেশ আশাবাদী। কেননা প্রতিবেদনগুলোতে পারস্পরিক সহমর্মিতা ফুটে উঠেছে। পোল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট মেদভেদেভ ও প্রধানমন্ত্রী পুতিনের এগিয়ে যাওয়ার এখনই সময়। জেগে উঠেছে কাতিনের স্মৃতি? মিশেল ডি কেনেডি বলেন, কাতিনে গণহত্যার ইতিহাস বেশ জটিল। নাৎসিরা ওই এলাকায় প্রায় পাঁচ হাজার মৃতদেহ উদ্ধার করেছিল। এ ছাড়া আরো কয়েক হাজার সৈন্যকে কাতিনের আশপাশে বিভিন্ন শিবির ও কারাগারে হত্যা করা হয়। কাতিন হয়ে উঠেছিল এক প্রতীকী স্মৃতিস্তম্ভ। নাৎসিরা কাতিনে সোভিয়েত বাহিনীর গণহত্যার প্রমাণ পেলেও সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ উল্টো এর দায় চাপিয়েছিল নাৎসিদের ওপরই। কেনেডি জানান, পোলিশ সরকারের নির্বাসিত প্রধানমন্ত্রী সিকরোস্কি ১৯৪৩ সালে কাতিন হত্যাযজ্ঞের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের অনুরোধ জানান। এরপর ওই ঘটনার জের ধরে সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী জোসেফ স্টালিন পোলিশ সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানানোর পর চার মাসেরও কম সময়ের মধ্যে এক শনিবার জিব্রাল্টারে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে সিকরোস্কি তাঁর ১৬ সফরসঙ্গীসহ নিহত হন। ওই বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার সঙ্গে অনেকে ষড়যন্ত্র আর নাশকতার গন্ধ খুঁজেছিলেন। কাকতালীয়ভাবে গত শনিবার আবারও বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর সিকরোস্কির কথা মনে পড়েছে অনেকের। তবে এবারের দুর্ঘটনায় কেউ নাশকতার গন্ধ খোঁজেননি। গত শনিবার বিমান বিধ্বস্ত হয়ে পোল্যান্ড নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ার খবর পোলিশ জনগণ এবং রাশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারীদের চোখে জল এনে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে পোল্যান্ডের কনসাল জেনারেল জিগমুন্ট মাটিনিয়া বলেছেন, ‘কাতিনে হত্যাযজ্ঞের কথা আমরা আমাদের কেবল মা-বাবার মুখে শুনেছি। প্রকাশ্যে আলোচনাও করতে পারিনি।’ তিনি আরো বলেন, ইতিহাসের পাতা থেকে ওই বর্বর হত্যাযজ্ঞের কথা মুছে ফেলা হয়েছিল। ১৯৮৯ সালে পোল্যান্ড স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ওই হত্যাযজ্ঞ স্মরণ করছে। তাই এই ইতিহাস পোলিশদের কাছে এখনো নতুন। এর সঙ্গে যোগ হলো গত শনিবার প্রেসিডেন্ট লেখ্ কাতিন্স্কিসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিহত হওয়ার ঘটনা।

গণতন্ত্রের অগি্নপরীক্ষা

সত্তর বছর ধরে লালন করা স্মোলেন্স্কের বিভীষিকাময় স্মৃতি বয়ে চলেছেন পোল্যান্ডের জনগণ। গত শনিবার আবার নতুন করে ওই একই স্থানে পোল্যান্ডের নেতৃত্বশূন্য হওয়া দেশটির গণতন্ত্রের জন্য অগি্নপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এটি যে পোল্যান্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, এ ব্যাপারে কেউ দ্বিমত করবে না। কেবল ক্ষমতাসীন দলই নয়, বিরোধী দলের শীর্ষ পদগুলোও শূন্য হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রের শীর্ষ অনেক পদ এখন খালি। এ সময় অনেকে অনেক ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজবেন। সংবিধান অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। এ সময়টা ঠাণ্ডা মাথায় চলতে হবে পোল্যান্ডের রাজনীতিকদের। তাঁদের মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো সংকটময় সময়ে গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখা। পোল্যান্ডের জনগণ এর চেয়ে অনেক সংকটময় সময় অতিক্রম করেছে। তাঁরা জানেন, কিভাবে ঝড়ের মোকাবিলা করতে হয়।

Advertisements

April 12, 2010 - Posted by | Uncategorized | , , , ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: