My Blog My World

Collection of Online Publications

ভারতকে তাড়িয়ে বেড়ানো গুপ্তচর

(নিবন্ধটি ৩ মে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে)

এম জে আকবর

মাতা হারি হতে হলে আপনাকে সুন্দরী হতে হবে না। কেবল আপনাকে পর্যাপ্ত সময় ব্যয় করতে হবে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য। মাতা হারি ছিলেন সার্কাস দলের অশ্বারোহী। আর তার এই নামটাও ছিল মঞ্চের। আসল নাম মার্গারেটা জিলে। প্যারিসভিত্তিক এই ডাচ নারী প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির এজেন্ট ছিলেন। প্রতিপক্ষ শিবিরে যৌন আবেদন জাগিয়ে তিনি গুপ্তচর বৃত্তি করেছেন। তবে কেবল ‘সুন্দরী’ হওয়ার  কারণেই তিনি ঐ দায়িত্ব পান নি।

মাতা হারির কর্মকান্ড পর্যবেণ করেছেন এমন একজনের মতে, তিনি পোশাকে যেমন সুন্দর, তেমনই সুন্দর পোশাক ছাড়াও। এটা মাতা হারির জন্য প্রশংসাসূচক হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। হতাশায় ডুবে তিনি ভরা আসরের মধ্যে নিজের পোশাক এক এক করে খুলেছেন। তার স্বামী ছিলেন ডাচ কলোনিয়াল আর্মির এক কর্মকর্তা, কর্মক্ষেত্র ছিল ইন্দোনেশিয়া। মাদকাসক্ত ঐ ব্যক্তি মাতা হরিকে নিয়মিত নির্দয়ভাবে পেটাতেন। মাতা হারির কারণেই তার স্বামীকে পালাতে হয়েছিল।

তবে আসাধারণ মেধার অধিকারী ঐ নারীর মধ্যে ছিল বাস্তবতার সঙ্গে পরাবাস্তবতা সমন্বয় করার সামর্থ্য। গোপনে সঙ্গে তথ্য সংগ্রহে নিজের পারদর্শিতা সম্পর্কে তিনি জানলেন। মাতা হারি নিজেকে আবিষ্কার করলেন, যৌন আবেদন সৃষ্টিতে সহায়ক ‘ভারতীয়’ রহস্যময় শিল্পকলার একজন দক্ষ পারদর্শী হিসেবে। তিনি তার সময়ের মানুষদের কাছে সেনসেশন হয়ে ওঠেছিলেন। মানুষ তার গুপ্তচর বৃত্তি নিয়ে যতোটা সন্দেহ করতো প্রকৃত অর্থে তিনি তত বড় গুপ্তচর ছিলেন না। তবে গুপ্তচরবৃত্তির চেয়ে তিনি অর্থ খরচ করতেন বেশি। শেষ পর্যন্ত জার্মানরা তার পাশে দাঁড়ায়নি। ১৯১৭ সালে ফরাসি ফায়ারিং স্কোয়াডে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।

নানামুখী পরিচয় ও ব্যক্তিত্ব গুপ্তচর হওয়ার জন্য অত্যাবশ্যক না হলেও সহায়ক গুণ। বিষাদের ব্যথা অথবা ব্যর্থতা অবচেতনেই থেকে যায়। কিন্তু মাত্রারিক্ত কল্পনা মানুষের দায়িত্ববোধের ধারণাকে দুর্বল করে তোলে এবং বাস্তব জীবন সম্পর্কে করে তোলে অন্ধ।

মাতা হারির সঙ্গে সাদৃশ্যের ক্ষেত্রে এটি নি:সন্দেহে একটি সমস্যা। মাধুরি গুপ্তকে ফাঁদে ফেলে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর হয়ে তথ্য নিয়েছেন পাকিস্তানি পুলিশ কর্মকর্তা মুদাসসর রানা। মনলোভা চিত্রকলার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতার কথা আমাদের জানা নেই। তবে লিঙ্গ এখানে কোনো ইস্যু নয়। আত্নমর্যাদা বোধও কামনার আগুনে মানুষই সবচেয়ে বেশি পোড়ে। ১৯৮০ এর দশকে রাজীব গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে করাচিতে ভারতীয় হাই কমিশনের এক সামরিক অ্যাটাশে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার এক নারী সদস্যের দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তবে একজন গুপ্তচরের মানসিক শক্তি অক্ষুন্ন ছিল। অর্থ বা যৌনতা যার জন্যই তারা ঐ সম্পর্কে জড়িয়ে থাকুননা কেন তাদের তারা দেশ বিরোধী কাজ করেছেন এমন তথ্য আমাদের জানা নেই।

উন্নিশশ’ পঞ্চাশ এর দশক ছিল পেশাজীবীদের জন্য বিপজ্জনক। সে সময় পেশাজীবীদের কর্মজীবনে যেমন ভাটা দেখা দিয়েছিল, তেমনি তাদের জীবনে নেমে এসেছিল হতাশা। ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিস (আইএফএস) বি-ক্যাডারের কর্মকর্তা মাধুরী গুপ্তা যে বয়সে সেকেন্ড সেক্রেটারি হয়েছেন সে বয়সে আইএফএসের নিয়মিত ব্যাচের অফিসাররা রাষ্ট্রদূত হতেন। ইসলামাবাদে পরিবেশ হয়তো তার স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে নিয়ে গেছে। আপনারা খেয়াল করে দেখবেন, গ্রেফতার হওয়ার পরও তার বাস্তব জ্ঞান ছিল না। তিনি তার গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে উল্টো প্রশ্ন করেছেন, ‘বিষয়টি (গুপ্তচরবৃত্তি) জানতে আপনাদের এতদিন লাগলো কেন?’ গুপ্তচর বৃত্তির চূড়ান্ত দায় অর্থাৎ তাকে ইসলামাবাদের মতো মিশনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত যে প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়েছে সে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও নিজেদের কাজের নিন্দা জানানোর অনীহা দেখা গেছে।

এই গুপ্তচরবৃত্তির জন্য পাকিস্তানকে দোষারূপ করা বোকামি। গুপ্তাকে গুপ্তচর বৃত্তিতে কাজে লাগানো সহজ ছিল এবং আইএসআই এ সুযোগ নিয়েছে। রানা ও গুপ্তা প্রায় সমবয়সী। রানা ‘ইফি’ ক্যাফেতে মাধুরীর কাছে প্রণয় ভিক্ষা চেয়েছিলেন। তিনি আইএসআই এর হয়ে মাধুরী গুপ্তার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন।

গুপ্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা দিল্লি পুলিশের জন্য প্রয়োজন। তবে নি:সন্দেহে দ্বিতীয় দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের। গুপ্তাকে পাকিস্তানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল? – এ প্রশ্নের উত্তর জানা খুবই জরুরি। ইসলামাবাদের মতো বৈরী পরিবেশের জন্য গুপ্তা মোটেই যোগ্য ছিলেন না। কেউ হয়তো ভেবে থাকবেন, উর্দু জানা সমযোগ্যতা সম্পন্ন ভারতীয় মুসলমানের তুলনায় গুপ্তার ইসলামাবাদে কাজ করতে কম সমস্যা হবে। এটি দিল্লির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নয়। তবে মাধুরী গুপ্তের গুপ্তচর বৃত্তির ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর ভারতীয় মুসলমানদের ঐ ধরনের পদে যাওয়া আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

মাধুরী গুপ্তাকে দিয়ে গুপ্তচর বৃত্তি করানো পাকিস্তানের ক্ষুদ্র সাফল্য হতে পারে। কারণ তিনি তার দু:সাহসিক বিশ্বাসের চেয়েও কম জানেন। এমনকি তিনি না জেনে ভুল তথ্যও দিয়ে থাকতে পারেন। তবে তিনি ভারতের বড় ধরনের ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রলোভনে পা দিয়ে একজন ভারতীয় কূটনীতিক, ভারতীয় মিশন প্রতিপক্ষের বরশি গিলেছে।

লেখক: ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক

নিবন্ধটি টাইমস অফ ইন্ডিয়া ব্লগ থেকে নেওয়া।

সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর: মেহেদী হাসান

Advertisements

May 2, 2010 - Posted by | Uncategorized | , , , ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: