My Blog My World

Collection of Online Publications

লেবার হারলে ব্রিটেন যা হারাবে

জোয়ান হ্যারি
(নিবন্ধটি ৭ মে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে)
লেবার সরকারের দিন বুঝি ফুরিয়ে এসেছে। তাদের এই বিদায় ব্রিটিশ পার্লামেন্ট থেকে, বর্তমান প্রজন্মের কাছ থেকে। সম্ভবত দলটি রাষ্ট্রক্ষমতা হারাচ্ছে চিরদিনের জন্য। প্রার্থীদের প্রচারণা সত্ত্বেও ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ১৯৯৭ সালের ১ মে লেবাররা যখন নির্বাচিত হয়েছিল, তখন আমার বয়স ১৮ বছর। কনজারভেটিভদের পতন উদযাপনের জন্য আমরা ছুটে গিয়েছিলাম ডাউনিং স্ট্রিটে। সিক্সথ ফরম কলেজের সায়েন্স ব্লকের কথা আমার আজও মনে পড়ে। কলেজ কর্তৃপক্ষ ওই ব্লকের ছাদ মেরামত করতে পারছিল না। তাই সামান্য বৃষ্টিও বাদ সাধত আমাদের পড়ালেখায়। আমার বন্ধুরা ঘণ্টাপ্রতি এক পাউন্ড পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করত। সরকারিভাবে তখনো পারিশ্রমিক নির্ধারিত হয়নি। আমার সবচেয়ে কাছের আত্দীয়দের একজন অর্থাভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না যে তিনি তাঁর সন্তানের জন্য ন্যাপকিন কিনবেন, না শীতে তাঁর ফ্ল্যাটে তাপবৃদ্ধির উপকরণ কিনবেন। টোরিদের ঘৃণ্য প্রচারণা ছিল ‘সিঙ্গেল মাদার’দের নিয়ে। আইনি স্বীকৃতি না থাকায় সে সময়ের ‘গে’দের দুর্দশার কথা আমি ভুলিনি। জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার আওতায় (এনএইচএস) একটি অস্ত্রোপচারের জন্য আমার এক আত্দীয়কে দুই বছরের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করতে হয়েছে। আমার মনে পড়ে, প্রতি রাতে তিনি ব্যথায় কাতরাতেন।
আজকের ব্রিটেনে এসব কিছুই হয় না। দৈবক্রমে এই দৃশ্য বদলে যায়নি। ব্রিটেনে কর আদায়ের হার আগের চেয়ে বেড়েছে। ১৯৯৭ সাল থেকে জনগণের সেবা খাতে সরকারি ব্যয় ৫৪ শতাংশ বেড়েছে। অস্ত্রোপচারের জন্য এখন আর কোনো ব্রিটিশ নাগরিককে ১৮ সপ্তাহের বেশি অপেক্ষা করতে হয় না। এখন আর কাউকে এমন স্কুলে যেতে হয় না, যেখানে ছাদ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। আজকের ব্রিটেনে শ্রমিকের নূ্যনতম মজুরি ঘণ্টায় পাঁচ পাউন্ড ৯৩ সেন্ট। দরিদ্রতম ১০ শতাংশ নাগরিকের প্রত্যেককে বছরে এক হাজার ৭০০ পাউন্ড কর রেয়াত দেওয়া হয়।
না, এসব তথ্য ব্রিটিশ বোমায় আঘাত পেয়ে অনাথ হওয়া ইরাকি শিশুদের যেমন কোনো সান্ত্বনা দেবে না, তেমনি প্রশান্তি বয়ে আনবে না মা-বাবার রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার অপরাধে আর্লস উডে বন্দি শিশুদের মধ্যেও। আর এ কারণেই আমাদের কাজ করতে হবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পক্ষে কাজ করছে এমন গ্রুপগুলোর সঙ্গে। কোন দল এখন ক্ষমতায়, তা এখানে বিবেচ্য নয়। আর দশকে দুইবার ভোট দিতে ভোটকেন্দ্রে জড়ো হওয়ার নামও গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্র হলো সরকারের কর্মকাণ্ড সব সময় পর্যবেক্ষণ করা এবং চাপ অব্যাহত রাখা।
তবে ১৯৯৭ সালের মে মাসের নির্বাচনের আগের ও পরের ব্রিটেনের মধ্যে পার্থক্য যে বিরাট, তা আমি অস্বীকার করতে পারি না। ভোট ছাড়া এই পরিবর্তন আসত না। লেবাররা যে পরিবর্তনের সূচনা করেছে, তার প্রতিটিরই বিরোধিতা করেছিল কনজারভেটিভরা। এর অর্থ হলো, কনজারভেটিভরা সরকার গঠন করলে এই অগ্রগতি তো হতোই না, পাশাপাশি লেবার সরকারের আমলের ব্যর্থতাগুলোও যোগ হতো। বৈশ্বিক মন্দার কারণে ব্যয় সংকোচনের যুগেও দুই দলের পার্থক্য স্পষ্ট। কনজারভেটিভ পার্টির ডেভিড ক্যামেরনের অগ্রাধিকারমূলক কাজ অনেকটাই যেন সাধারণ। অনেকটা লটারির আদলে তিনি ব্রিটেনের সবচেয়ে বিত্তবান তিন হাজার এস্টেটের জন্য দুই লাখ পাউন্ড কর রেয়াত দেবেন। তাঁর এই পরিকল্পনা মার্গারেট থ্যাচারের পরিকল্পনার চেয়ে আগ্রাসী। আর এটি অর্থনৈতিক অবস্থাকে আরো খারাপ করে তুলবে। ক্যামেরন বলেছেন, তিনি আয়ারল্যান্ডের অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করতে চান। আয়ারল্যান্ডে সরকার অর্থনৈতিক প্রণোদনার বিরোধিতা করে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাপক হারে ব্যয় সংকোচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থনীতিবিদ রব ব্রাউন বলেছেন, আয়ারল্যান্ডে ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করার পর সরকার আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করেছে, অর্থনীতির আকার ১৫ শতাংশ কমেছে। শান্তিপূর্ণ সময়ে শিল্পোন্নত কোনো দেশের অর্থনীতির আকার এতটা ছোট অতীতে হয়নি। আয়ারল্যান্ডে বেকারের হার ইউরোপে প্রায় সর্বোচ্চ। ত্রিশের দশকে ব্রিটেনে যে নীতিগত পরিবর্তন এসেছিল, তেমনই পরিবর্তন দেখার প্রতীক্ষায় আছে আইরিশ জনগণ।
ব্রিটিশ জনগণ আবার কনজারভেটিভদের ক্ষমতায় দেখতে চায় না। আমাদের ৬০ শতাংশ ভোটার ক্যামেরনের বিরুদ্ধে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিভাবে আমরা তাঁর ক্ষমতায় যাওয়া ঠেকাতে পারি?
প্রথমত, আমাদের মনে রাখতে হবে যে নোয়াম চমস্কি বলেছেন, ‘দুজন মন্দের মধ্যে তুলনামূলক কম মন্দকে বেছে নেওয়া খারাপ কিছু নয়। কথাটি শুনতে খারাপ শোনায়। তবে এটা ভালো কথা। এতে আপনারা কম ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’ আমাদের লক্ষ রাখতে হবে, ‘কম মন্দ’ যেন নিরঙ্কুশ সাফল্য না পায়। এরপর সারা বছর ভালোর জন্য আন্দোলন ও প্রচারণা চালানোর পক্ষে অবস্থান নিয়ে দুর্বল সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা যাবে। যদি টোরি-বিরোধীরা তাদের ভোট দিতে গিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্রিটিশ জনগণ ডেভিড ক্যামেরনকে ডাউনিং স্ট্রিটে দেখতে পাবে।
লেবার ও কনজারভেটিভদের মধ্যে ব্যবধান খুবই সামান্য। আর এ সামান্য কারণেই বিপুলসংখ্যক মানুষের বেঁচে থাকা ও মরে যাওয়া নির্ভর করছে। যদি কেউ বলেন, এই পার্থক্য তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়, তাহলে তাঁকে এও স্বীকার করতে হবে, ১৯৯৭ সালের মে মাসে রয়াল ফেস্টিভ্যাল হলে সূর্যোদয়ের মাধ্যমে যে পরিবর্তন সূচিত হয়েছে, তা তিনি অস্বীকার করছেন। আজ অনেকে বলেন, নূ্নতম মজুরি নির্ধারণের কারণে কল সেন্টারের কর্মীরা আগের চেয়ে পাঁচ গুণ মজুরি পাচ্ছেন, গে জনগণ ‘সিভিল পার্টনারশিপ’ পাচ্ছে কিংবা বৃদ্ধাকে আবার হাঁটতে আর দুই বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। তাঁদের জীবনে দেখা এই পরিবর্তনের সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতার পার্থক্য অনেক।
লেবাররা এই পরিবর্তন এনে দিয়েছিল।
লেখক : লন্ডন ইনডিপেন্ডেন্টের কলামিস্ট
সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর : মেহেদী হাসান

Advertisements

May 7, 2010 - Posted by | Uncategorized | , , ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: