My Blog My World

Collection of Online Publications

ফাঁসিতে কি আত্মঘাতী হামলা থামে?

(নিবন্ধটি ১১ মে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে)
জাভেদ নাকভি
মুম্বাইয়ে হামলাকারী আজমল কাসাবকে আমরা গত সপ্তাহে আদালতের কাঠগড়ায় চোখ মুছতে দেখেছি। আরো দেখেছি রায় নিয়ে জনগণের আগ্রহ। ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার দায়ে কাসাবকে ভারতের একটি আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। আদালত কি কাসাবকে শাস্তি দিয়েছেন, নাকি তার নিয়োগকারীর নির্ধারণ করে দেওয়া মৃত্যুর দিনক্ষণ এগিয়ে এনেছেন? আদালত কি তাঁর রায়ের মাধ্যমে একজন সন্ত্রাসীকে শহীদ করে তুলছেন?
ভারতে এমনটা প্রায়ই হচ্ছে। ঘৃণ্য অপরাধ করে সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের কাছে তারা বীরের সম্মান পাচ্ছে। নাথুরাম গডসের কথাই ধরুন। মহাত্দা গান্ধীকে হত্যার দায়ে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। গান্ধী হত্যা মামলার রায়ে হত্যাকাণ্ডের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত গডসের অন্যতম সহকর্মী বীর সাভারকারকে আজকের ভারতের প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) একজন সত্যিকারের বীর হিসেবেই মনে করে। ভারতীয় পার্লামেন্টের দেয়ালে দেয়ালে সাভারকারের ছবি টাঙানো হয়। ভারতে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলের কয়েকজন সদস্য যখন ওই ছবি নামিয়ে ফেলার হুমকি দিয়েছিলেন, তখন দলের ব্রাহ্মণ লবি তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। দেয়ালে দেয়ালে আজও শোভা পাচ্ছে সাভারকারের ছবি। সাভারকারের প্রভাব যে কেবল কংগ্রেস ও বিজেপির রাজনীতিবিদদের মধ্যেই আছে তা নয়, আরো অনেকে তাকে একজন জাতীয় নেতা হিসেবে দেখেন।
১৯৮৪ সালে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে সাতওয়ান্ত সিং ও বেওয়ান্ত সিং নামের দুজন শিখ পুলিশ কনস্টেবল ইন্দিরা গান্ধীর বাসভবনে দায়িত্ব পালনকালে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করেছিল। দায়িত্ব পালনরত অন্য প্রহরীদের গুলিতে মৃত্যু হয়েছিল বেওয়ান্ত সিংয়ের আর সাতওয়ান্ত সিং কেবল বেঁচে ছিল আদালতের রায়ে ফাঁসিতে ঝুলে মরার জন্য। বিশ্বাসের মূল্য দিতে শহীদ হয়েছে_এমন বিশ্বাস নিয়ে বেওয়ান্ত ও সাতওয়ান্ত সিংয়ের ছবি স্বর্ণমন্দিরের পবিত্র অঙ্গনে রাখা হয়েছে।
কাশ্মীরের আইকন মকবুল বাটের ফাঁসি ১৯৮৪ সালে দিলি্লর তিহার কারাগারে কার্যকর করার অনেক বছর আগে তার ফাঁসির রায় হয়েছিল। মকবুল বাটের সময়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিদের মতো তাকেও রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক প্রয়োজনে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। ১৯৭৯ সালে আমি তার সঙ্গে যখন কারাগারে দেখা করেছিলাম, তখন তাকে খুব শান্ত দেখাচ্ছিল। মনে হয়, নির্যাতনের কারণেই তাকে এমন মনে হচ্ছিল। মকবুল বাটের মুক্তির জন্য তার সহকর্মীরা তৎপর হয়ে না উঠলে সে আরো বেশি দিন বাঁচত। মকবুল বাটের মুক্তির পক্ষে কথা না বলায় বার্মিংহামের এক কূটনীতিককে অপহরণের পর তারা হত্যা করেছিল। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই মকবুল বাটের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। কাশ্মীরের মুক্তির জন্য আন্দোলনকারীরা মকবুল বাটকে তাদের মাতৃভূমির জনক বলে মনে করে। শ্রীনগরের ‘শহীদ সমাধি’তে তাকে সমাহিত করার জন্য স্থান নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে।
বীরের মতো সম্মান পাওয়া ব্যক্তিরা বিচারের মুখোমুখি হলেও আটক হননি। দিলি্লতে ব্যাপকভাবে পরিচিত শিখ হত্যাকারীদের আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি। তারা স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়িয়েছে। নিজ ও অন্য সম্প্রদায় এবং দলে বীর বলে গণ্য হয়েছে। পুলিশ নিরীহ, নিরপরাধ শিখদের গ্রেপ্তার করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। ওই খুনিদের কেউ কেউ কংগ্রেস সরকারের মন্ত্রীও হয়েছে।
অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংস করায় অনেকের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ উপেক্ষা করে বাবরি মসজিদ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে সময় গোপনে ধারণ করা এক ভিডিও টেপে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাতে রক্ত দেখা গেছে। ১৯৯৩ সালে মুসলমানদের বিরোধী সহিংসতা বিষয়ে শ্রীকৃষ্ণ কমিশনের প্রতিবেদনে বাল থ্যাকারে এবং তাঁর শিবসেনার নাম আসার পর তাঁরা আরো জনপ্রিয় হয়েছেন।
আজমল কাসাবের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়ার কয়েক দিন আগে ভারতের উত্তরাঞ্চলে উচ্চ শ্রেণী পরিচালিত একটি আদালতব্যবস্থার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। সংবিধানস্বীকৃত বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি ভারতে বেশ কয়েক দশক ধরে উচ্চ শ্রেণীর ব্যক্তিরা ইচ্ছামাফিক আদালত বসিয়ে গোত্রের বাইরে বিয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দলিতদের শাসন-শোষণ করেছেন। তাদের আদালতের (পঞ্চায়েত) আদেশ অমান্যকারীদের মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হয় এবং তা খুব দ্রুত কার্যকর করা হয়। পঞ্চায়েতের রায় ভারতের উত্তরাঞ্চলে আইনের মতো মনে করা হয়। সম্প্রতি ভারতের একটি সাংবিধানিক আদালত পঞ্চায়েতে এক দম্পতিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অপরাধে পঞ্চায়েতের তিনজন সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এরপর ওই অঞ্চলের উচ্চ শ্রেণীর ব্যক্তিরা সরকার উৎখাতের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছেন। বর্তমানে এটি ভারতের রাজনীতিতে আলোচিত বিষয়। পঞ্চায়েত নিয়ে আদালতের ওই রায়ের পর উচ্চ শ্রেণীর ব্যক্তিরা দলিতদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছে। সম্প্রতি একটি পঞ্চায়েত আফগানিস্তানের আদলে ঘোষণা দিয়েছে, পঞ্চায়েত নিয়ে যারা সমালোচনা করে বা বিরোধিতা করে, তাদের সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে।
বিচারব্যবস্থার যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে, তেমনি আছে সীমাবদ্ধতাও। ২০০৮ সালের জুন মাসে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের বিচারপতি কে এস আহলুওয়ালিয়া ১৮ থেকে ২১ বছর বয়সীদের মধ্যে বিবাহসংক্রান্ত ১০টি মামলা পর্যালোচনা করে তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেছেন, ‘হাইকোর্ট মামলায় প্লাবিত হচ্ছে। আদালতের বিচারককে দম্পতিদের অধিকার ও স্বাধীনতা সম্পর্কিত আবেদন নিষ্পত্তি করতে হচ্ছে। নাগরিকদের অধিকারের ব্যাপারে রাষ্ট্র নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। রাষ্ট্র কখন ঘুম থেকে জাগবে এবং আদালতকে আর কত কাল নাগরিকের অধিকারের ব্যাপারে রায় দিতে হবে?’
আইনসভা ও রাষ্ট্রের নির্বাহীরা এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু কিভাবে? সম্প্রতি পঞ্চায়েত সরকার উৎখাতের হুমকি দিয়ে তার ক্ষমতা জানান দিয়েছে।
মুম্বাইয়ের রাস্তায় গত সপ্তাহে কাসাবের রায়ের পর পুলিশ ও উৎসুক মানুষকে বিজয়চিহ্ন দেখাতে দেখেছি। পুলিশ কর্মকর্তারা অভিযোগের তদন্ত দ্রুত করতে গিয়ে তাঁদের কষ্ট ও ত্যাগের কথা বলেছেন। রায় ঘোষণার পরপরই কাসাবকে ফাঁসিতে ঝোলানোর দাবি তুলেছে অনেক মানুষ। অনেকে আবার তার আপিলের অধিকার থাকার সমালোচনা করেছে।
আমি ওই ভিড়ে যোগ দিতে পারিনি। হয়তো তারা ঠিক বলছে। কিন্তু এর পরদিন এ নিয়ে মুম্বাইয়ে আর কোনো কথা হয়নি। কেউ বলেনি, ‘এটা বোমা হামলাকারীদের যুগ। বোমা হামলাকারীদের নিজের জীবনের প্রতি কোনো মায়া বা সম্মানবোধ নেই। কিভাবে এই মৃত্যুদণ্ড জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই করতে সাহায্য করবে?’

লেখক : ভারতের সাংবাদিক
পাকিস্তানের ডন পত্রিকা থেকে সংক্ষিপ্ত
ভাষান্তর: মেহেদী হাসান

Advertisements

May 11, 2010 - Posted by | Crime | , , ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: