My Blog My World

Collection of Online Publications

সংঘাতের পথে হাঁটছে নেপাল?

(নিবন্ধটি ১৪ মে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে)

প্রশান্ত ঝা

টানা ছয় দিন সাধারণ ধর্মঘটের পর গত সপ্তাহে নেপালে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়েছে। শান্তি, সংবিধান, জাতীয় স্বাধীনতা, বেসামরিক প্রশাসনের কর্তৃত্ব ও মাওবাদী নেতৃত্বাধীন জাতীয় জোট সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে ইউনিফাইড কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল-মাওবাদী (ইউসিপিএন-এম) ওই ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল। আর এতে অচল হয়ে পড়েছিল গোটা দেশ। সে সময় লক্ষাধিক মাওবাদীকে কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন শহরে ধর্মঘটের পক্ষে কাজ করতে দেখা গেছে। তবে ধর্মঘটের সময় বিভিন্ন শহরে নীরব চাঁদাবাজি হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থান থেকে ধর্মঘট সফল করতে আসা মাওবাদী কর্মীদের রাতে থাকার জায়গা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করতে বাধ্য করার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া পুরো ধর্মঘট ছিল শান্তিপূর্ণ।
এবারের ধর্মঘটের বিশেষ দিকটি হলো রাজপথে উৎসবের আমেজ। বড় বড় সড়কে বিপ্লবী সংগীতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচ-গান করেছে মাওবাদীরা। অনেকে আবার গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনেছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাধব কুমার নেপালবিরোধী সরকার এবং বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপবিরোধী বক্তব্য। ওই বক্তব্যের বিষয় ছিল স্পষ্ট_আমরাই এ দেশে প্রজাতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এনেছি। আমরাই এ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও ক্ষমতাশালী দল। আমরা নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেশ চালাচ্ছে পরাজিতরা। তারা শান্তি ও সংবিধান চায় না। ভারতের কারণেই এমনটা হচ্ছে। তাই আমাদের আন্দোলন হবে সরকারের বিরুদ্ধে এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে। মাওবাদী নেতৃত্ব বলছে, নেপালের নিরাপত্তা বাহিনীতে নেপালের কৃষকদের সন্তানরাও আছে। তারা আমাদের এ আন্দোলনের বিরুদ্ধে নয়।
তবে ধর্মঘট প্রত্যাহারের পরদিন দলের চেয়ারম্যান পুষ্প কমল দাহাল ওরফে প্রচন্ড এক বিশাল জনসভায় ধর্মঘট প্রত্যাহারের দুটি কারণ উল্লেখ করেছেন। এর একটি হলো জনগণের জীবনযাত্রা সহজ করা এবং মাওবাদীবিরোধী সরকারি ষড়যন্ত্র বন্ধ করা। এর পর ৯ মে মাওবাদী স্ট্যান্ডিং কমিটি সরকারের সঙ্গে আলোচনায় না বসার এবং নিজেদের আরো প্রশিক্ষিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। জাতীয় পরিষদের মেয়াদ শেষ করার তিন দিন আগে ২৫ মে দেশজুড়ে বিক্ষোভ মিছিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মাওবাদীরা।
নেপাল এখনো সংবিধান চূড়ান্ত করতে পারেনি। ২০০৯ সালের মে মাসে সেনাপ্রধান জেনারেল রুকমানগাকে বরখাস্ত করতে ব্যর্থ হয়ে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন প্রচন্ড। এরপর থেকে মাওবাদীরা আবার অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেছে। তারা প্রেসিডেন্টের ‘অসাংবিধানিক কাজ’ সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসছে। উল্লেখ্য, প্রচন্ড সেনাপ্রধানকে বরখাস্ত করতে চাইলে প্রেসিডেন্ট সেনাপ্রধানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। এটি মাওবাদীদের আন্দোলনকে আরো উসকে দিয়েছে। প্রচন্ডর পদত্যাগের পর থেকেই মাওবাদীরা নিয়মিত নেপালের রাজপথে আন্দোলনে সোচ্চার। তাদের সদস্যসংখ্যাও বাড়ছে। মাওবাদীবিরোধী জোটের কোনো পদক্ষেপই কাজে আসছে না। ইতিমধ্যে মাওবাদী এবং মাওবাদীবিরোধীদের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। মাওবাদীবিরোধীদের অভিযোগ, মাওবাদীরা বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নয়। মাওবাদীরা নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র করছে।
অন্যদিকে মাওবাদীরা মনে করছে, অন্য দলগুলো দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার ব্যাপারে তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করছে না। তারা মাওবাদীদের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে।
ভারত মাওবাদীদের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ পোষণের পর নেপালের মাওবাদীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। মাওবাদীরা মনে করে, নেপালে গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ভারতের ভূমিকা ছিল। এ ছাড়া ভারত প্রচন্ডর বদলে মাওবাদী নেতা বাবুরাম ভট্টরাইকে প্রধানমন্ত্রী করতে চাইলে প্রচন্ড নিজেও বিব্রত ও বিচলিত হয়েছিলেন। অন্যদিকে নেপালের সেনাবাহিনী এবং মাওবাদীরা পরস্পরকে শত্রুপক্ষ বলে মনে করতে শুরু করেছে। মনে করা হয়, গত চার বছরের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো মাওবাদীবিরোধী শক্তি জোরালো হয়েছে। এতে আছে মাওবাদীবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, প্রেসিডেন্ট, সেনাবাহিনী ও ভারত।
প্রচন্ড ভেবেছিলেন, অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট মাওবাদীবিরোধীদের মধ্যে প্রভাব ফেলবে। তার পরিকল্পনায় চারটি বিশেষ দিক ছিল। প্রথমত, রাজপথে কয়েক লাখ মানুষ মাওবাদীদের পক্ষ নিয়ে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করবে। দ্বিতীয়ত, কাঠমান্ডু অচল হয়ে পড়লে প্রধানমন্ত্রী মাধব কুমার নেপালের পদত্যাগে চাপ সৃষ্টি হবে। তৃতীয়ত, অব্যাহত ধর্মঘট চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে মাওবাদীদের টনক নড়বে। চতুর্থত, মাওবাদীবিরোধী জোটের মধ্যে ভাঙন ধরবে।
প্রচন্ডর এই হিসাব ছিল ভুল। সরকার অনড় অবস্থানে ছিল এবং মাওবাদীদের দাবির কাছে নতিস্বীকার করেনি। অন্যদিকে মাওবাদীরা ধর্মঘটের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটাতে পারবে না বুঝে কিছুটা পিছু হটেছে। ২৮ জুন সংবিধান প্রণয়নের শেষ দিন পর্যন্ত ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়াও তাদের পক্ষে কঠিন ছিল।
মাওবাদীবিরোধীরা এই পিছু হটাকে বিজয় হিসেবে দেখছে। তবে অনেকে গত সপ্তাহে মাওবাদীদের ধর্মঘটকে ভবিষ্যৎ আন্দোলনের মহড়া হিসেবেই মনে করছেন। শান্তি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হলে মাওবাদীসহ সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে নতুন করে সমঝোতা হওয়া জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাওবাদীদের উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে গেলে নেপালে সংঘাতের আশঙ্কাই বাড়বে।
লেখক : নেপাল টাইমসের কলামিস্ট
আউটলুক ইন্ডিয়া থেকে সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর : মেহেদী হাসান

Advertisements

May 14, 2010 - Posted by | Foreign Affairs, International, Peace, Uncategorized |

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: