My Blog My World

Collection of Online Publications

যে যুদ্ধ মাইন-বুলেটে জেতার নয়

সিদ্ধার্থ বরাদারাজন

(নিবন্ধটি ২১ মে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে। কালের কণ্ঠে নিবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন)

ভারতের ছত্তিশগড়ের সাধারণ বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে পুনর্বাসনের জন্য আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন একদল আইনজীবী। এটি তাঁদের বা ‘সুশীল সমাজের কর্মীদের’ কোনো অপরাধ নয়। বরং ছত্তিশগড়ে নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে হত্যার দায় মাওবাদীদের নিতে হবে। রাষ্ট্রকেও নিতে হবে তার নাগরিকদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার দায়।

মাওবাদীদের নির্মূলে ছত্তিশগড়ে ‘অপারেশন গ্রিন হান্ট’কে গণমাধ্যমের সৃষ্টি বা কল্পনা বলে অভিহিত করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম। অপারেশন গ্রিন হান্ট চলুক আর নাই চলুক_গত সোমবার দান্তেওয়ারায় বাসে হামলা প্রমাণ করে, মাওবাদীদের সহিংস তৎপরতা চলছেই। গত ছয় সপ্তাহে ছত্তিশগড়ের মাওবাদীরা ভারতের সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ) এবং স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর ৯০ জনেরও বেশি সদস্যকে হত্যা করেছে। এর মধ্যে গত এপ্রিলে চিন্তালনারে কেবল একটি ঘটনায়ই মারা গেছে কমপক্ষে ৭৬ জন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধ ছাড়া কোনো একক ঘটনায় সম্ভবত এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যক হত্যাকাণ্ড। গত রোববার মাওবাদীদের নিজস্ব ‘আদালতে’ ফাঁসি দেওয়া হয়েছে ছয় গ্রামবাসীকে। তাদের বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনীকে তথ্য দেওয়ার অভিযোগ এনেছে মাওবাদীরা। এ ছাড়া বেসামরিক নাগরিকদের বহনকারী বাসে বোমা হামলা চালিয়ে তারা ১৫ জনকে হত্যা করেছে। আহত হয়েছে আরো অনেকে।

মাওবাদীরা সর্বশেষ যে হামলা চালিয়েছে, সম্ভবত তার প্রধান লক্ষ্য ছিল বিশেষ পুলিশ কর্মকর্তাদের (এসপিও) একটি দল। ওই পুলিশ কর্মকর্তারা বেসামরিক যাত্রীবোঝাই বাসের ছাদে বসে যাচ্ছিলেন। বাসে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক যাত্রী আছে জেনেও তারা স্থলমাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে বা দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত বোমা ফাটিয়েছে।

গত মার্চে মাওবাদীদের অন্যতম মুখপাত্র আজাদ নামে এক ব্যক্তিকে আমার লিখিতভাবে প্রশ্ন করার সুযোগ হয়েছিল। আমি জানতে চেয়েছিলাম, তিনি বা তার গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক ‘হিউম্যানিটারিয়ান’ আইন মানেন কি না। এখানে বলা প্রয়োজন, ওই আইনে সশস্ত্র সংঘাত কেমন হতে পারে তা স্পষ্টভাবে বলা আছে। বেসামরিক জনগণ বা বন্দিকে হত্যা করা ওই আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। লিখিতভাবে প্রশ্ন করার সমস্যা হলো, পাল্টা প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে না। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমার মনে হচ্ছে_আজাদ হয়তো বলতেন, তাদের যোদ্ধারা যুদ্ধের আইন মানেন না। মাইন পেতে রাখার যৌক্তিকতার বিষয়ে তিনি কোনো উত্তর দেননি। তবে তার নীরবতা বা বাসে হামলা_এ ব্যাপারে তাদের অবস্থান জানতে আমাদের খুব একটা কষ্ট করতে হয় না। মাওবাদীরা তো আর গান্ধী নন।

কর্তৃপক্ষ সর্বশেষ হামলা পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নিতেই পারে যে মাওবাদীরা ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তবে ভারতের গণতন্ত্রে সরকারের নীতির পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক করার সুযোগ আছে। আর এত দিন ধরে ছত্তিশগড়ে মাওবাদীবিরোধী অভিযানে যে সাফল্যের দাবি করেছিল, তা একেবারে মিথ্যা প্রমাণ হলো মাওবাদীদের সাম্প্রতিক তৎপরতায়।

হত্যাকাণ্ডের পেছনে সামরিক ও নৈতিক দুটি ইস্যুই আছে। নির্দোষ ও নিরীহ মানুষকে হত্যা করা নৈতিকভাবে যেমন অন্যায়, তেমনি সামরিকভাবেও বোকামি। সাধারণ গ্রামবাসীকে মাওবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করে পুলিশের খাতায় নাম লিখিয়ে হয়তো সাফল্য দাবি করা যায়। কিন্তু প্রকৃত অর্থে সাফল্য পাওয়া এখানে অত্যন্ত কঠিন। গত মঙ্গলবার ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাওবাদীদের দমনে দুই ধরনের কৌশল নেওয়ার কথা বলেছেন। এর একটি হলো, পুলিশি অভিযান জোরদার। আর অন্যটি হলো উন্নয়ন। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, দুটি কৌশলের কোনোটিই এখানে কাজে আসবে না। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের নানামুখী কৌশলের মাশুল গুনছে আজকের ছত্তিশগড়। সরকারের সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলের কারণে কয়েক হাজার নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে কয়েক হাজার ঘরবাড়ি। উৎখাত হয়েছে আদিবাসীরা। গত বছর গোমপারে এসপিওরা দুই বছর বয়সী এক শিশুর হাতের আঙুল কেটে নিয়েছে। ২০০৯ সালের ২০ অক্টোবর ভারতের দি হিন্দু পত্রিকা সেই ছবি প্রকাশ করেছে। সে সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা তাঁর মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো নিন্দা জানানো হয়নি।

দেখা যাচ্ছে, মাওবাদীদের প্রতি জনসমর্থন যেখানে কমার কথা, সেখানে উল্টো হচ্ছে। ২০০৭ সালে সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা মামলায়ও এ কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন সময় বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষকে মাওবাদীদের পক্ষ নিতে দেখা গেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর ওপর তার দল ও জোটের শরিকরা মাওবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। কিন্তু মনমোহন, সোনিয়া জানেন যে মাওবাদীদের ব্যাপারে অসহিষ্ণু হলে তাদের সমস্যা আরো বাড়বে।

মাওবাদীদেরও বোঝা উচিত, তারা এই যুদ্ধে জয়ী হতে পারবে না। মাওবাদীদের দমনে সরকারকে আরো পুলিশ, সেনা নিয়োগের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন সাধারণ মানুষ, শ্রমিক, কৃষক, আদিবাসী, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা ফেরানোর মতো রাজনৈতিক আন্দোলন। আমাদের দুর্ভাগ্য, আজকের ছত্তিশগড়ে কোনো রাজনীতি নেই।

লেখক : সাংবাদিক

ভারতের দি হিন্দু পত্রিকা থেকে সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর : মেহেদী হাসান

Advertisements

May 21, 2010 - Posted by | International, Peace | ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: