My Blog My World

Collection of Online Publications

ঠাকুরবাড়ির খোঁজে

সুগত শ্রীনিবাস রাজু

(নিবন্ধটি ২৪ মে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে। কালের কণ্ঠে নিবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন)

এটি গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের দেড় শতম বছর। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই বার্ষিকী উদযাপনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী নিয়ে বিশেষ আগ্রহ আছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও প্রতিবেশী বাংলাদেশে। জাতীয় ‘আইকন’ হিসেবে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টাও চলছে। এমনকি যখন আমি এই লেখা লিখছি, তখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিতভাবে একটি বিশেষ আবেদন জানাচ্ছেন। বিশ্বের খ্যাতনামা নিলাম সংস্থা যেন মধ্য জুনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রকর্মগুলোকে নিলামে তুলতে না পারে সে ব্যাপারেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে মুখ্যমন্ত্রীর আবেদন। মুখ্যমন্ত্রীর যুক্তি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রকর্ম ভারতীয় সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ। সেগুলো ফিরিয়ে আনা হোক। গত বছর নিউইয়র্কে জনা কয়েক ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম বিক্রির উদ্যোগ নেওয়ার পর দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছ থেকে আমরা এমন উদ্বেগ দেখেছি।

আমাদের বীর, মহামানবদের কাজ বাঁচিয়ে রাখা বা রক্ষার প্রচেষ্টা যেন তাঁদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানানোর মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাকে গত সেপ্টেম্বরের একটি ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে দিন। গুরুদেবের দেড় শতম জন্মবার্ষিকী পালনের জন্য আজকের মতো কোনো প্রস্তুতি বা উদ্যোগ তখন ছিল না। একটি সেমিনারে অংশ নিতে আমি তখন কলকাতায়। কয়েকটি দিন কোনো বিশেষ পরিকল্পনা ছাড়াই ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াচ্ছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৈতৃক বাড়ি ঠাকুরবাড়ি যাওয়ার আগ্রহ আমার অনেক দিনের। তবে আমি জানি না ওই বাড়িটি ঠিক কোথায়। ছোটবেলা থেকেই আমি ‘ঠাকুরবাড়ি’ নামের চেয়ে ‘জোড়াসাঁকো’ নামের সঙ্গে বেশি পরিচিত। তবে এটা জানতাম যে ঠাকুরবাড়ির অবস্থান কলকাতার জোড়াসাঁকোয়। একসময় আমি ভুল করে জোড়াসাঁকোকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি ভাবতাম।

সত্যজিৎ রায়ের চারুলতা বারবার দেখেছি আর মুগ্ধ হয়েছি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলায় আমরা রবীন্দ্রনাথের ‘ভুবন মনমোহিনী’ গানটি শুনেছি। আমরা বিশ্বাস করি, শরৎচন্দ্র, বিমল মিত্র, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। বিখ্যাত ব্যক্তিদের লেখনী আমার ভাষা কনাঢ়ায় যাঁরা অনুবাদ করেছেন অহবালা শংকর তাঁদের অন্যতম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখনী আমাদের পাঠ্যপুস্তকে গুরুত্ব ও গর্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে। ঠাকুরবাড়ি যেতে আমি কোনো গাইডের শরণাপন্ন হইনি। খোঁজ নিইনি গুগল ওয়েবসাইটের। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শহর এই কলকাতায় আমি কোনো পর্যটক সাজতে চাইনি। বালিগাঁওয়ে একটি ট্যাক্সি নিয়ে আমি এর চালককে বলি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি নিয়ে যেতে। আমি আপন মনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি খোঁজার যে খেলা খেলছি, তাতে ট্যাক্সিচালককে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার বেশি অনুরোধ করার কথা ছিল না। আমার যুক্তি ছিল, রবীন্দ্রনাথ বিশ্বখ্যাত। সবাই নিশ্চয়ই তাঁর বাড়ি চিনবে। সব সময় নিশ্চয়ই দেশি-বিদেশি মানুষ ঠাকুরবাড়িতে যাতায়াত করেন। তাই ওই বাড়ির খবর ট্যাক্সিচালকদের অজানা থাকার কথা নয়। আমাকে বহনকারী ট্যাক্সির চালকও ঠাকুরবাড়ির অবস্থান জানতে চাননি। আমি ট্যাক্সির পেছনের আসনে বসে রাস্তার দুই পাশের ছবি দেখছি। ট্যাক্সিচালক প্রায় ১৫ মিনিট ধরে সোজা চললেন। এরপর তিনি ডানে মোড় নেন। তিনি সোজা ছুটে চলেছেন। এভাবে আরো ৩০ মিনিট পথ চলার পর গরমে যখন গা থেকে ঘাম ঝরতে শুরু করেছে তখন আমি জানতে চেয়েছিলাম, আমরা কি সঠিক গন্তব্যে যাচ্ছি? ট্যাক্সিচালক বোঝাতে চাইলেন, তিনি সঠিক পথেই যাচ্ছেন। এরপর আরো পাঁচ মিনিট পথ চলার পর তিনি গাড়ি থামিয়ে বললেন, তিনি কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। অন্যদের সঙ্গে কথা বলে তিনি ঠাকুরবাড়ির অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চান। তিনি একটি চায়ের দোকানে গেলেন এবং কথা বললেন। আমি অবাক হয়ে দেখছি, তিনি সিগারেট ধরিয়ে চা পান করছেন। ধূমপান শেষ করে তিনি ফিরে আসেন। তিনি ট্যাক্সি ঘুরিয়ে ইউ টার্ন নিয়ে আবার আগের পথে ছুটলেন। কিছু সময় চলার পর আমি কিছুটা শঙ্কিত হই এবং এক বন্ধুর কাছ থেকে জানার জন্য ট্যাক্সি থামাতে বলি। তিনি থামলেন এবং বিনয়ের সঙ্গে জানালেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি যে কলকাতায় তা কেউ জানে না। যাঁদের কাছে তিনি ঠাকুরবাড়ির ঠিকানা জানতে চেয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকেই শান্তিনিকেতনের পথ দেখিয়েছেন। আমার বন্ধু আমাকে প্রথমে সেন্ট্রাল এভিনিউয়ে যেতে বলে। সেখানে সবাই ঠাকুরবাড়ির ঠিকানা জানেন বলে আমাকে জানানো হয়। আবার ইউ টার্ন করে ট্যাক্সি সেন্ট্রাল এভিনিউয়ে পেঁৗছতে প্রায় আধা ঘণ্টা সময় লাগে। সেখানে রিকশা ও ট্যাক্সিচালকদের কাছে ঠাকুরবাড়ি সম্পর্কে জানতে চাইলে তাঁরা সঠিক পথ দেখাতে পারেননি। আমি আবার আমার বন্ধুকে ফোন করার পর সে আমাকে জানায়, ঠাকুরবাড়ি গিরিশ পার্ক মেট্রো স্টেশনের কাছে। স্টেশনটি আমাদের পেছনে থাকায় আমরা আবার ইউ টার্ন নিই। এর পর প্রথম দুটি রাস্তার কোনোটিই ঠাকুরবাড়ির রাস্তার মতো মনে হয়নি। আবারও কিছু সময় পথ চলার পর একটি কাচারি ঘর দেখে আমি ঠাকুরবাড়ির খোঁজ জানতে চাইলে তাঁরা আমাদের রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে বলেন। তাঁদের বিশ্বাস, সেখানে কেউ না কেউ ঠাকুরবাড়ির খোঁজ জানবেন। হ্যাঁ, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পেঁৗছে আমাদের বুঝতে ভুল হলো না যে এটাই ঠাকুরবাড়ি। আমি যখন ওই বাড়িতে ঢুকছি তখন আমার মনে হচ্ছিল, আমার আত্দা আর আমার মধ্যে নেই। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকি। সেখানে আবার ছবি তোলা বারণ। সে সময় আমিই ছিলাম একমাত্র দর্শনার্থী।

এখন সব দৃশ্যপট বদলে গেছে। সরকারি, বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা চলছে। কলকাতা থেকে আমার বন্ধুরা জানিয়েছে, এখর ঠাকুরবাড়ি দেখতে অপেক্ষমাণ মানুষের লাইন অনেক বড় হয়। তবে এখনো কোনো সাইনবোর্ড নেই।

বিখ্যাত ব্যক্তিদের শহরে গিয়ে তাদের বাড়ি দেখার ঝোঁক আমার বেশ পুরনো। ১৯৯০ সালের জুলাই মাসে আমি আমার বাবার সঙ্গে বাজি ধরেছিলাম কর্ণাটকের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কে ভি পুত্তপার বাড়ি দেখতে পাব না বলে। কলকাতার সেই ট্যাক্সিচালকের মতো সেদিনও আমরা পুত্তপার বাড়ির ঠিকানা বলিনি। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা ঘুরে ট্যাক্সিচালক আমাদের পুত্তপার বাড়ির সামনে হাজির করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, আমি বাজিতে হেরে গেছি।

লেখক : সাংবাদিক

আউটলুক ইন্ডিয়া থেকে সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর : মেহেদী হাসান

Advertisements

May 24, 2010 - Posted by | Uncategorized | ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: