My Blog My World

Collection of Online Publications

অপারেশন গ্রিন হান্টের শহুরে অবতার

(নিবন্ধটি ১৪ জুন কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে। কালের কণ্ঠের ওয়েবসাইটে নিবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন)
অরুন্ধতী রায়
বিদ্রোহী মাওবাদীদের দমনে ভারত সরকার যখন সেনা ও বিমানবাহিনী মোতায়েনের কথা ভাবছে, তখন বিভিন্ন শহরে ঘটছে নানা বিস্ময়কর ঘটনা। গত ২ জুন মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হলো গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জন্য কমিটির (কমিটি ফর দ্য প্রোটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস) সাধারণ সভা। এতে প্রধান বক্তা হিসেবে ছিলেন দি ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলির সম্পাদকীয় পরামর্শক গৌতম নবলক্ষ ও আমি। সভার স্থায়িত্ব ছিল তিন ঘণ্টারও বেশি। টেলিভিশনসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ওই সভা বেশ গুরুত্ব পেয়েছিল। পরদিন ৩ জুন রেডিফ ডটকমের মতো বেশ কয়েকটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও টিভি চ্যানেলে প্রচারিত ওই সভা সম্পর্কিত খবরের তথ্য মোটামুটি সত্য ছিল। টাইমস অব ইন্ডিয়ার মুম্বাই সংস্করণে সভা সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল_’আমাদের এমন এক ধারণা দরকার যা বামের পক্ষে নয়, আবার ডানের পক্ষেও নয়।’ আবার দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল_’পর্বতের বক্সাইট কি আমরা ছেড়ে দিতে পারি?’ ওই সভার ভিডিও ইউটিউবেও স্থান পেয়েছে।
ওই সভার পরদিন (৩ জুন) আমার বক্তব্য নিয়ে বিভ্রান্তিকর খবর প্রচার করে প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই)। বার্তা সংস্থাটির উদ্ধৃতি দিয়ে ওই বিভ্রান্তিকর খবর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনলাইনে যোগ হয় ৩ জুন দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে। ওই খবরের শিরোনাম ছিল_’মাওবাদীদের প্রতি সমর্থন দিয়ে অরুন্ধতীর হুমকি_সাহস থাকলে আমাকে গ্রেফতার করুন’। খবরের কয়েকটি অংশ এখানে উল্লেখ করা যাক। ‘গ্রন্থপ্রণেতা অরুন্ধতী রায় মাওবাদীদের সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি এও বলেছেন, কর্তৃপক্ষের সাহস থাকলে মাওবাদীদের সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানানোর অপরাধে যেন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।’ ‘নকশাল আন্দোলন সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি সহিংসতা সমর্থন করি না। তবে আমি ঘৃণ্য সংঘাতভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণের বিরোধী।’ (?)
‘এটি সশস্ত্র আন্দোলনই হওয়া উচিত। গান্ধীর মতো বিরোধিতার ক্ষেত্রে জনসমর্থন প্রয়োজন, যা এখানে অনুপস্থিত। সংগ্রামের পথ বেছে নেওয়ার অনেক আগেই জনগণ এ নিয়ে বিতর্ক করেছে।’
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ করে মাওবাদীদের ভয়াবহ হামলায় ৭৬ জন সিপিআরএফ ও পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার পর অরুন্ধতী রায় ‘দান্তেওয়ালার জনগণকে’ অভিনন্দন জানিয়ে স্যালুট করেছেন। মাওবাদীদের প্রতি তিনি তাঁর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘আমি মাওবাদীদের পক্ষে। আমি পরোয়া করি না।…পারলে আমাকে জেলে নিয়ে যাও।’ ওই সংবাদের শেষ অংশ দিয়েই আমার বক্তব্য শুরু করা যাক। মাওবাদীরা সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (সিপিআরএফ) ৭৬ জন সদস্যকে হত্যার পর ‘দান্তেওয়ালার জনগণকে’ আমার অভিন্দন জানানো নিয়ে পাঠকদেরও যে ধারণা দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে মানহানির অভিযোগে ফৌজদারি মামলা করা যায়। সিএনএন-আইবিএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আমি স্পষ্ট করে জানিয়েছি, সিপিআরএফ সদস্যদের মৃত্যু আমার কাছে মর্মান্তিক। আমার কাছে মনে হয়, গরিবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ধনীরা সিপিআরএফকে তাদের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। মুম্বাইয়ের সভায় আমি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সমালোচনা করে বলেছিলাম, নৃশংসতার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ কোনো অর্থবহ ফল আনবে না। আমি বলেছিলাম, সরকার বা মাওবাদী_কারো হত্যাকাণ্ডের পক্ষ নিতে আমি এখানে আসিনি। তবে উপজাতি অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে ২৭টি একে-৪৭, ৩৮টি আইএনএসএএস, সাতটি এসএলআর, ছয়টি লাইট মেশিনগান, একটি স্টেনগান এবং একটি দুই ইঞ্চি মর্টার দিয়ে সিপিআরএফ কী করেছে তা জানা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। পিটিআইয়ের প্রতিবেদনের বাকি অংশ বিদ্বেষমূলক। মাওবাদীদের ব্যাপারে আমার বক্তব্য পরিষ্কার। আমি তাদের নিয়ে প্রায়ই লিখছি। আমি ওই সভায় বলেছিলাম, সরকার প্রতিটি আন্দোলন, প্রত্যেক কর্মীকে দমন করছে। সরকার মাওবাদীদের ব্যাপারে নির্যাতন-নিপীড়নের পথ বেছে নিয়েছে। আমি আরো বলেছিলাম, সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেই যে কাউকে মাওবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। কলিঙ্গনগর ও জগৎসিংহপুর এলাকার মানুষের ব্যাপারে আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ওই এলাকা দুটির জনগণ শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্দোলন করছে। অথচ তাদের প্রায় সব সময়ই শত শত সশস্ত্র পুলিশ দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে থাকতে হচ্ছে। কোনো কারণ ছাড়াই পুলিশ তাদের লাঠিপেটা করছে, গুলি করছে। আমি বলেছি, স্থানীয় জনগণ প্রতিরোধ আন্দোলনে নামার আগে অনেক ভেবেছে। জঙ্গলে গিয়ে আমি বিপ্লবীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা আমাকে বলেছে, গান্ধীকে তারা অনুসরণ করছে না। মুম্বাইয়ের সভায় আমি জানতে চেয়েছিলাম, জঙ্গলে আশ্রয় নেওয়া অভুক্ত মাওবাদীরা আর কতদিন অভুক্ত থাকবে? তবে আমি নিশ্চিত যে আমি বলিনি, মাওবাদীদের আন্দোলন সশস্ত্রই হওয়া উচিত। (এ ধরনের প্রচারণার কারণ সম্পর্কে আমি নিশ্চিত নই।) আমি বিভিন্ন আন্দোলনের ব্যাপারে বলেছিলাম। এসব আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে। আমি ওই আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। আমি আরো বলেছিলাম, সরকারকে প্রশ্ন করার আগে কিছু প্রশ্ন আমরা নিজেরাই নিজেদের করতে পারি। এরপর আমি যা বলেছিলাম তা হলো_ ‘আমি পক্ষে তা জানা আমার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। নিজের অবস্থান সম্পর্কে জানার ব্যাপারে আমি কারো পরোয়া করি না। কর্তৃপক্ষ আমাকে তুলে নিয়ে কারাগারে পাঠাতে পারে। এর পরও আমি বলব, কমরেডরা যে প্রশ্নগুলো আমাকে করেছিল তা আমাদের নিজেদের করতে হবে।’
আমি ওই সভায় বলেছিলাম, গান্ধীর অনুসরণে প্রতিরোধ আন্দোলন এখন কাজে আসছে না। গান্ধীর আন্দোলনের অনুকরণে নর্মদা বাঁচাওয়ের মতো আন্দোলনে উন্নয়নের বিপ্লবী লক্ষ্য ছিল। অন্যদিকে মাওবাদীদের নিজস্ব ধারার আন্দোলন জনগণের মধ্যে সাড়া ফেলছে। মাওবাদীরা রাষ্ট্রীয় সম্পদ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা করপোরেশনের কাছে বিক্রির বিরোধিতা করেছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকার জনগণের প্রত্যাশার চেয়ে রাষ্ট্রীয় কয়লানীতির ব্যবধান কি খুব বেশি ছিল? জনগণ কি তাদের এলাকার পর্বতের বক্সাইটের দাবি ছাড়বে?
পাবলো নেরুদার ‘স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি’ আমি পড়েছি। সেখানে একটি পুরনো যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। পিটিআইয়ের প্রতিবেদক তার প্রতিবেদনকে আমার বক্তব্যের ব্যাখ্যা হিসেবেও দাবি করতে পারবেন না। এটি সুস্পষ্ট মিথ্যাচার। বিস্ময়করভাবে এক দিনের পুরনো প্রতিবেদন ৪ জুন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, প্রচার হয় টিভি চ্যানেলে। অথচ আগের দিন তাদের প্রতিবেদকদের সঠিক খবরই তাদের সংবাদমাধ্যমে স্থান পেয়েছিল। দি ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল_’প্রচারণার জন্য অরুন্ধতী রায় অং সান সু চি হতে চায়’। সংবাদমাধ্যমগুলো পরপর দুই দিন (এক দিন সত্য, এক দিন মিথ্যা) কেন এক বিষয়ে খবর প্রচার করল, তা জানতে আমি খুবই আগ্রহী।
৪ জুন সন্ধ্যা ৭টায় দুজন লোক মোটরসাইকেলে চড়ে এসে দিলি্লতে আমার বাড়ির জানালায় ঢিল ছোড়ে। ক্ষুব্ধ লোকজন এসে জড়ো হলে তারা পালিয়ে যায়। এর কয়েক মিনিটের মধ্যে জিটিভির একজন সাংবাদিক এসে ঘটনা সম্পর্কে জানতে চান। ৫ জুন দৈনিক ভাস্করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মাওবাদীদের প্রতি আমার যদি এতই টান থাকে তাহলে আমি যেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরা ছেড়ে জঙ্গলে চলে যাই। ৮ জুলাই একটি পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, মাওবাদীদের সমর্থন দেওয়ার অভিযোগে আমার বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে।
সামরিক গোয়েন্দারা যাকে সাইঅপস (সাইকোলজিক্যাল অপারেশন্স) বলেন, এটি কি তা-ই? নাকি এটি অপারেশন গ্রিন হান্টের শহুরে অবতার? এখানে একটি সংবাদমাধ্যম সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনাকে ঠেকাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সুযোগ করে দিচ্ছে। মাওবাদীদের দমনে সরকার যে অপারেশন গ্রিন হান্ট শুরু করেছে, তা এখন যেন আমার দরজায় কড়া নাড়ছে। সরকার এ দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করবে না। জনগণকেই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হবে। সেন্সরশিপ এখন একমাত্র সমস্যা নয়। মিথ্যা তথ্য দিয়ে সংবাদ সৃষ্টি করা সেন্সরশিপের চেয়েও ভয়াবহ ব্যাপার।
লেখক : কথাশিল্পী, মানবাধিকার ও পরিবেশকর্মী
পাকিস্তানের ডন পত্রিকা থেকে
সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর : মেহেদী হাসান

Advertisements

June 14, 2010 - Posted by | Analysis, Foreign Affairs, Peace, Political | ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: