My Blog My World

Collection of Online Publications

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে পাকিস্তানে প্রগতিশীল শক্তি দুর্বল হয়েছে : অ্যাডভোকেট জাফর মালিক

(নিবন্ধটি ২৪ জুন কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে। কালের কণ্ঠের ওয়েবসাইটে নিবন্ধটি পড়তে ক্লিক করুন)

ঢাকায় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিশ্বশান্তি, ন্যায়বিচার ও ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণকালে পাকিস্তানের বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট জাফর মালিক কালের কণ্ঠকে সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মেহেদী হাসান।

কালের কণ্ঠ : বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে কি কোনো পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন?
জাফর মালিক : এর আগেরবার যখন ঢাকায় এসেছি, তখন এ দেশে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন চলছে। নিরাপত্তার চাদরে মোড়া এ শহরে সে সময় ঘরের বাইরে বের হওয়ার মতো অবস্থা ছিল না। এখন পুরোপুরি ভিন্ন চিত্র। এ দেশে সরকার বদল হয়েছে। তবে এর চেয়ে অনেক বড় পরিবর্তন হয়েছে পাকিস্তানে। সেখানে আবার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। দেশটির প্রধান দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব কমেছে। দলগুলো বুঝতে পেরেছে, তাদের অভিন্ন শত্রু সেনাবাহিনী। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব যত বাড়বে, সেনাবাহিনীর ক্ষমতায় আসার পথ ততই প্রশস্ত হবে। এটাই এখন পাকিস্তানের রাজনীতিকদের জন্য বড় শিক্ষা।
কালের কণ্ঠ : অনেক রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন ও পাকিস্তানি বাহিনীর ভূমিকাকে আপনি কিভাবে দেখেন?
জাফর মালিক : ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সরকারের ভূমিকা বিশেষ করে সামরিক অভিযানের জন্য আমার দুঃখবোধ হয়। এটা সত্যি যে সে সময় পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার ব্যাপারে পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো ভিন্নমত ছিল না। পাকিস্তানের অখণ্ডতা আমিও চেয়েছিলাম। তবে দ্বিমত ছিল সামরিক অভিযান নিয়ে। আমরা হাতেগোনা কয়েকজন বলেছিলাম, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। তাই সরকার গঠনের অধিকার তাদেরই। পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য সামরিক অভিযানের পক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানের সর্বত্র জোরালো কণ্ঠস্বরের বিপরীতে আমরা ছিলাম ক্ষীণ ও দুর্বল কণ্ঠ। এ জন্য আমাদের বিশ্বাসঘাতক অপবাদ শুনতে হয়েছে, সহ্য করতে হয়েছে নির্যাতন ও নিপীড়ন। এর পরও আমরা শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে পাকিস্তানে স্বাক্ষর সংগ্রহও করেছিলাম।
কালের কণ্ঠ : ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সেনাবাহিনীর বিপথগামী সদস্যরা হত্যা করার পরপরই পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ফলে আপনাদের সব ক্ষোভ কি তাহলে তাঁর ওপরই ছিল?
জাফর মালিক : বিষয়টি আসলে এ রকমই। পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ সব সময় মনে করেছে, শেখ মুজিবুর রহমানের কারণেই পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করা যায়নি। এ ছাড়া বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নিলে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আপত্তি আসত। পাকিস্তান সরকার তার পরাজিত, যুদ্ধাহত সামরিক বাহিনীর মনোবলে নতুন করে আঘাত করতে চায়নি।
কালের কণ্ঠ : স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে পাকিস্তানে কী প্রভাব পড়েছে?
জাফর মালিক : প্রথমত রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান তার অখণ্ডতা হারিয়েছে। তবে এর চেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে পাকিস্তানের প্রগতিশীল শক্তির। পূর্ব পাকিস্তানে প্রগতিশীল পক্ষ শক্তিশালী ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতিক্রিয়াশীলরা শক্তিশালী থাকায় প্রগতিশীলরা বিপন্ন হয়েছে। আজকের পাকিস্তানেও প্রতিক্রিয়াশীলরা শক্তিশালী। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, প্রগতিশীলরা আজও সেখানে বেশ দুর্বল। বাংলাদেশে মানবতার পক্ষে যে কথা বলা যায়, পাকিস্তানে এখন তা বলার উপায় নেই।
পাকিস্তানে সেনাবাহিনী সবচেয়ে সুসংগঠিত সংস্থা। প্রগতিশীল রাজনীতির বিকাশ না হওয়ায় বারবার সামরিক আইন জারি হয়েছে, সেনাবাহিনী ক্ষমতায় এসেছে। গণতন্ত্র বারবার বিপন্ন হয়েছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে, জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনামলে। ইসলামী আইন জারির মাধ্যমে গণতন্ত্র ও প্রগতিশীল চেতনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। পাকিস্তানে আজকের দুরবস্থার জন্য আমি মূলত তিনটি বিষয়কে দায়ী করব। এগুলো হলো_পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার পর প্রগতিশীল চেতনা দুর্বল হয়ে পড়া, বারবার সামরিক শাসন এবং জেনারেল জিয়াউল হকের জারি করা ইসলামী আইন।
কালের কণ্ঠ : ঢাকায় যুদ্ধাপরাধবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
জাফর মালিক : আমরা মনে করেছিলাম, সামরিক শক্তি ব্যবহার করলে পূর্ব পাকিস্তানের আন্দোলন স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নেবে। আমি কোনোভাবেই পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যাকে সমর্থন করতে পারিনি, আজও পারি না। সম্মেলনে যোগ দিয়ে বুঝতে পেরেছি, যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার বেশ আন্তরিক। এ বিচারের প্রতি এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের যে সমর্থন আছে সে ব্যাপারেও সরকার অবগত আছে। আমি চাই, যুদ্ধাপরাধের বিচার হোক।
কালের কণ্ঠ : যুদ্ধাপরাধের বিচারে পাকিস্তানের সরকার ও সুশীল সমাজ কিভাবে সমর্থন দিতে পারে?
জাফর মালিক : পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচারে সমর্থন দেবে কি না_এ ব্যাপারে কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য শুনিনি। তবে পাকিস্তান সরকারের ওপর সেনাবাহিনীর ভূমিকা যেখানে প্রবল, সেখানে হয়তো সমর্থনের সুস্পষ্ট ঘোষণা না-ও আসতে পারে। এটি অনেকটা রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য দুঃখ প্রকাশের দাবির মতো বিষয়। পাকিস্তান সরকার চাইলেও তাতে সেনাবাহিনীর আপত্তি থাকবে। তবে আমার মনে হয়, সাধারণ জনগণ মনে করবে, যুদ্ধাপরাধ নিতান্তই অতীতের বিষয়। বিচারের প্রতি সুশীল সমাজ ও প্রগতিশীল শক্তির নৈতিক সমর্থন থাকবে।
কালের কণ্ঠ : পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতেও বেশ কয়জন যুদ্ধাপরাধী ছিল। পাকিস্তান সরকার তাদের বিচারের আশ্বাস দিয়ে নিয়ে গেলেও বিচার করেনি। বাংলাদেশ সরকার এ দেশীয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নিলেও পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কি?
জাফর মালিক : পাকিস্তান সরকার যেহেতু দেশে ফিরে যাওয়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেনি, সেহেতু বাংলাদেশ ওই যুদ্ধাপরাধীদের ফেরত পাঠানোর দাবি তুলতেই পারে। কারণ যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছিল এ দেশে। তবে পাকিস্তান সরকার এতে কতটা রাজি হবে, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এর একটাই কারণ, সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর মানোবলে আঘাত করে এমন কিছু হয়তো পাকিস্তান সরকার করবে না।
কালের কণ্ঠ : পাকিস্তানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির কোনো মিল ও অমিল আছে কি?
জাফর মালিক : বাংলাদেশ জন্মগতভাবেই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি পেয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর পূর্ব পাকিস্তান শাখা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য সামরিক বাহিনীর অভিযানকে কেবল সমর্থনই করেনি, রাজাকার, আলবদর, আলশামসসহ বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যায় সহযোগিতা করেছে। অখণ্ডতা আমরাও চেয়েছিলাম। কিন্তু তাকে আমরা ধর্ম বাঁচানোর সঙ্গে তুলনা করিনি। জামায়াত তা করেছিল। দলটি পাকিস্তানি বাহিনীকে সর্বক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছে। বর্তমানে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর নীতি, আদর্শ ও কর্মকাণ্ডে কোনো পার্থক্য নেই। উভয়েই ইসলামী আইন চায়। পাকিস্তানে বর্তমানে যে জঙ্গি ও তালেবান সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, ধর্মের নামে সেগুলোকে লালন করেছে জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলো। জামায়াত অবশ্যই প্রগতিশীল চেতনা ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য হুমকি। বর্তমান পাকিস্তানে জামায়াত যতটা সফল হয়েছে, বাংলাদেশে মনে হয় ততটা হবে না। কারণ এ দেশে জামায়াতের প্রতিপক্ষ প্রগতিশীল শক্তি বেশ সক্রিয়। তবে সামরিক শাসকরা সব সময় ধর্মভিত্তিক আইন জারি বা ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে উৎসাহিত করে নিজেদের বৈধতা খোঁজার চেষ্টা করে। বাংলাদেশেও তা-ই হয়েছে। এখন কোনো দল যদি যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রাক্কালে রাজনৈতিক স্বার্থে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নেয়, তাহলে এ সমাজে তো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। যুদ্ধাপরাধ যে অন্য আট-দশটা অপরাধের চেয়ে আলাদা, তা এ সমাজের সবারই বোঝা উচিত।
কালের কণ্ঠ : যুদ্ধাপরাধের বিচারে সরকারের ট্রাইব্যুনাল গঠন ও এ পর্যন্ত নেওয়া উদ্যোগগুলোকে কি যথেষ্ট মনে হয়েছে?
জাফর মালিক : আমার মনে হয়েছে, যুদ্ধাপরাধের বিচারে সরকার বেশ আন্তরিক। বিচারপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ হবে বলে আমি মনে করি। যুদ্ধাপরাধের মতো ঘৃণ্য অপরাধ করেও যাতে কেউ শাস্তি এড়াতে না পারে তা নিশ্চিত হওয়া দরকার।
যুদ্ধাপরাধের বিচার ও এ দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার কোনো শঙ্কা আছে কি?
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে উঠতে পারে, বিশেষ করে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীরা বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত। বর্তমান সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা এ মেয়াদে বাস্তবায়ন করতে না পারলে ভবিষ্যতে এ নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। যুদ্ধাপরাধের বিচারের ব্যাপারে সবার আন্তরিকতা থাকা জরুরি। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জাতীয় ইস্যুতে সব দলের মধ্যে একতা থাকা। আমার নিজ দেশ পাকিস্তান নিয়ে শঙ্কা আছে। সোয়াত ইস্যুতে সেনাবাহিনী আবারও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সরকারের চেয়ে সেনাবাহিনীর বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠাটা যেকোনো দেশের জন্যই ক্ষতিকর।

Advertisements

June 24, 2010 - Posted by | Crime, Foreign Affairs, Group, Interview | , , ,

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: