My Blog My World

Collection of Online Publications

দিল্লির ‘পরিবর্তিত’ মনোভাবের দূত হয়ে আজ আসছেন প্রণব

(প্রতিবেদনটি ৭ আগস্ট কালের কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে)

(The Report has been published at The Daily Kaler Kantho on 7 August, 2010)

টিটু দত্ত গুপ্ত ও মেহেদী হাসান
ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি আজ শনিবার ঢাকা আসছেন বাংলাদেশের প্রতি নয়াদিল্লির ‘পরিবর্তিত’ মনোভাবের বার্তা নিয়ে। বৃহৎ অর্থনীতির দেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম বাংলাদেশ সফরকে এভাবেই দেখা হচ্ছে ভারতের গণমাধ্যমে। আর তাঁর এ সফরকে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীপর্যায়ে এ বছরের জানুয়ারিতে স্বাক্ষরিত যৌথ ইশতেহার বাস্তবায়নের সূচনা হিসেবে দেখছেন এ দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যক্তিত্বরা।
নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী আজ বিকেলে ঢাকা পেঁৗছে সন্ধ্যায় বাংলাদেশ সরকার ও ভারতের এক্সিম ব্যাংকের মধ্যে এক বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারের ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর প্রত্যক্ষ করবেন প্রণব মুখার্জি। এরপর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির সঙ্গে বৈঠক করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে তাঁর আজ রাতেই দিলি্ল ফেরার কথা।
এক বিলিয়ন ডলারের এ ঋণ চুক্তি দ্বিপক্ষীয় ক্ষেত্রে ভারতের সবচেয়ে বড় প্যাকেজ। এ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রণব মুখার্জিকে পাঠিয়ে মনমোহন সিং এ বার্তাই দিতে চান যে বাংলাদেশ ভারতের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। ভারতের গণমাধ্যমে এ ধরনের মন্তব্য করে বলা হয়েছে, চুক্তি বাস্তবায়নে ভারতের দীর্ঘসূত্রতায় বিরক্ত বাংলাদেশ। বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিনিময়ের সম্পর্ককে কখনো গুরুত্ব দেননি ভারতের আমলা ও কূটনীতিকরা। তাই রাজনৈতিকপর্যায়ে উপনীত সিদ্ধান্তগুলো ঝুলে থাকে যুগ যুগ ধরে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীকে ঢাকা পাঠানোর মধ্য দিয়ে দিলি্ল বোঝাতে চায়, চুক্তি বাস্তবায়নে তারা আগের চেয়ে এখন অনেক তৎপর।
নয়াদিলি্ল থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, প্রণব মুখার্জি ৮০ লাখ পিস বাংলাদেশি পোশাকের বিনা শুল্কে ভারতে রপ্তানি কোটা বাড়ানোর ঘোষণা দেবেন। তিন লাখ টন চাল রপ্তানির একটা ঘোষণাও দিতে পারেন। ঈদের পর যৌথ সীমান্তসংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক এবং যেকোনো সময় তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা শুরুর ঘোষণাও থাকতে পারে। ইছামতী নদীতে ড্রেজিংয়ের ব্যাপারে ভারতের অনাপত্তির কথাও আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে পারেন তিনি। মেঘালয় সীমান্তে দুটি ‘বর্ডার হাট’ চালুর বিষয়েও কথা বলবেন তিনি।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও খুলনায় যৌথ বিনিয়োগে এক হাজার ৩০০ মেগাওয়াটের দুটি তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাবও ভারত দিতে পারে।
ভারতের ঋণ মূলত বাংলাদেশের যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা হবে বলে জানান অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা। তিনি বলেন, বিশেষ করে রেল খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়া সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী অন্য খাতেও ব্যয় করা যাবে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, ভারতের ঋণ সহায়তায় নির্মিতব্য এসব যোগাযোগ অবকাঠামো মূলত উত্তর-পূর্ব ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের রাজ্যগুলোর মালামাল বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে আনা-নেওয়ার (ট্রানজিট) সুযোগ তৈরি করবে। ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করতে পারবে ভারতের সাতটি রাজ্য। এসব বিষয়ে যৌথ ইশতেহারে বাংলাদেশ সম্মতি দিয়েছে। প্রণব মুখার্জির সফরের সময় ট্রানজিট থেকে আয় বাড়ানো, বাণিজ্য বাধা দূর করা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ চাওয়াসহ দ্বিপক্ষীয় নানা বিষয়ে বাংলাদেশ আলোচনা করতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো, শুল্ক-অশুল্ক বাধা দূর করা, নেগেটিভ লিস্ট (আমদানি-নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকা) সংক্ষিপ্ত করার বিষয়ে ভারতের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এ ছাড়া জ্বালানিসহ অবকাঠামো খাতে ভারতের সরকারি ও বেসরকারিপর্যায়ে আরো বিনিয়োগ আসতে পারে।
গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা এসেছিলেন প্রণব মুখার্জি। তখন তিনি ছিলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী। সে সফরের সময় বাংলাদেশের সঙ্গে তিনি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। মে মাসে সে দেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন তিনি। এর প্রায় দুই বছর আগে (১ ডিসেম্বর ২০০৭) ঢাকা এসে সিডর-বিধ্বস্ত বাংলাদেশের খাদ্য সমস্যার কথা বিবেচনা করে ভারতের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে সাড়ে পাঁচ লাখ টন চাল রপ্তানির ঘোষণা দেন। এ ঘোষণায় স্বস্তি পেয়েছিল তখনকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে প্রণব মুখার্জির একাধিকবার ঢাকা সফরের ফলাফলের প্রেক্ষাপটে তাঁর এবারের সফরকে নিছক প্রতিশ্রুতি পুনরাবৃত্তির শুভেচ্ছা সফর হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান বলেন, তাঁর এ সফরকে প্রধানমন্ত্রীপর্যায়ে স্বাক্ষরিত যৌথ ইশতেহার বাস্তবায়নের শুরু হিসেবে ধরা যায়। বাণিজ্য বাধাসহ দ্বিপক্ষীয় নানা সমস্যার কথা বিশদভাবে বলা আছে ওই ইশতেহারে। এগুলো একে একে বাস্তবায়ন করলেই দুই দেশের সম্পর্কের অনেক কিছুরই সুরাহা হবে। নতুন আর কিছু করার দরকার নেই।
আজ সন্ধ্যায় ঢাকায় যে এক বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে, তার রূপরেখা ঠিক হয়েছিল দিলি্লতে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বৈঠকে। ১১ জানুয়ারির সে বৈঠকের পর ঘোষিত ৫১ দফার যৌথ ইশতেহারে দুই দেশের মধ্যে সড়ক, রেল ও নদীপথে যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের কথা বলা হয়। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর দিয়ে ভারতের মালামাল সড়ক ও রেলপথে পরিবহন করতে দিতে সম্মত হয় বাংলাদেশ। নেপাল ও ভুটানকেও অনুরূপ সুবিধা দেওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করে বাংলাদেশ। তবে এ বিষয়ে ভারত সুস্পষ্টভাবে সম্মতি দেয়নি। যৌথ ইশতেহারে ভারত থেকে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির জন্য গ্রিড স্থাপনের কথা বলা হয়। এ ছাড়া নদী পুনর্খনন (ড্রেজিং), তিস্তাসহ যৌথ নদীগুলোর পানি বণ্টন, সীমান্ত চিহ্নিতকরণ সমস্যা সমাধানসহ নানা বিষয়ে সম্মত হয় দুই প্রতিবেশী দেশ।
সে বৈঠকের সাত মাসের মাথায় ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের যৌথ ঘোষণার বাস্তবায়নের সূচনা হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। চুক্তির বাস্তবায়নে দেরি নিয়ে ভারতের আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সমালোচনা করেছে সে দেশের গণমাধ্যম। তবে দুই দেশের সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে সম্পাদিত এর আগের অনেক চুক্তি বা প্রতিশ্রুতির সঙ্গে তুলনা করলে এবারের যৌথ ঘোষণার বাস্তবায়ন শুরু করতে খুব দেরি হয়েছে বলে মনে করছেন না সরকারের নীতিনির্ধারক, গবেষক ও ব্যবসায়ী নেতারা।
ড. মসিউর বলেন, ‘আমি মনে করি, যে গতিতে বাস্তবায়ন এগোচ্ছে, তা ঠিকই আছে।’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. কে এ এস মুরশিদ বলেন, ‘ট্রানজিটের মাধ্যমে ভারতের মূল অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছি আমরা। বিনিময়ে আমরা রপ্তানি বাণিজ্যের বাধাগুলোর অপসারণ চাইতে পারি। ট্রানজিট বাণিজ্য থেকে লাভ করতে হলে আসাম ট্রেড-এর একটা বড় অংশ আমাদের পেতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন আলোচনার। প্রণব মুখার্জির সফর থেকেই এ আলোচনার সূত্রপাত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে বিনিয়োগ, তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে আমাদের অংশীদার হওয়ার বিষয়েও আলাপ-আলোচনা করতে হবে।’
ড. কে এ এস মুরশিদ বলেন, ‘শুধু ট্রানজিট ব্যবসা দিয়ে তো হবে না। আমাদের দরকার বৈষম্যহীন, সমান ভিত্তির একটা পারস্পরিক সম্পর্ক।’
সার্ক চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট আনিসুল হক বলেন, তাঁর সফর জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রীর দিলি্ল সফরের সময় উচ্চপর্যায়ে উপনীত হওয়া চুক্তি ও সমঝোতা বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করবে। আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও তাঁর এ সফর গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট আবদুল মাতলুব আহমাদ বলেন, ‘আমরা চাই ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যে নন-ট্যারিফ বাধাগুলো দূর হোক। পোশাক রপ্তানির কোটা শেষ হয়ে গেছে, সেটা আরো উদার করা হোক। ৫৮৭টি পণ্যের যে নেগেটিভ লিস্ট, তা ছোট করা হোক। প্রণব মুখার্জির সঙ্গে বৈঠকে এসব বিষয় তুলে ধরতে পারে বাংলাদেশ। অবকাঠামো উন্নয়নে আমরা সরকারিপর্যায়ে আরো ঋণের জন্য ভারতকে বলতে পারি, ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট অবকাঠামোর উন্নয়নে তাদের বিনিয়োগ করতে বলতে পারি।’
ভারতীয় ঋণ ১৪টি বাছাই করা প্রকল্পে খরচ করবে সরকার। যোগাযোগ ও অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, ১২০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে তিতাস নদীর ওপর রেলসেতু নির্মাণ করা ছাড়াও রেল ইঞ্জিন ও বগি কেনার জন্য ৮৯ মিলিয়ন ডলার, উচ্চক্ষমতার ছয়টি ড্রেজার কেনার জন্য ৭১ মিলিয়ন ডলার, আশুগঞ্জে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল স্থাপনের জন্য ৩৬ মিলিয়ন ডলার খরচ করা হবে।
ভারত থেকে বিদ্যুৎ অমদানির কথাও বলা আছে ইশতেহারে। ঋণের টাকা থেকে ১৫৮ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে বিদ্যুৎ গ্রিড স্থাপন করা হবে। ভারতের কম্পানির সঙ্গে গত সপ্তাহেই বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি করেছে পিডিবি। গ্রিড তৈরি হলে প্রথম পর্যায়ে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসবে। বাস ক্রয়ের জন্য ৩৬ মিলিয়ন ডলার প্রকল্পসহ মোট ১৪ প্রকল্পে সরকার এ অর্থ ব্যয় করবে বলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান।

Advertisements

August 9, 2010 - Posted by | Uncategorized

No comments yet.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: